রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিজ্ঞান ও ইসলামের আলোকে কোরবানি কি সত্যিই অমানবিক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৭, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

বিজ্ঞান ও ইসলামের আলোকে কোরবানি কি সত্যিই অমানবিক

প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিমণ্ডলে এক শ্রেণির চিন্তাবিদদের হাত ধরে ‘পশুপ্রেম’ বা ‘অমানবিকতা’র যুক্তি তুলে কোরবানির তীব্র বিরোধিতা করার একটি চিরচেনা রেওয়াজ লক্ষ্য করা যায়। তবে ইসলামি শরিয়তের মূল দর্শন, পবিত্র কুরআনের বাণী এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিরপেক্ষ গবেষণার আলোকে গভীর বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই মহান ইবাদত কোনো উদ্দেশ্যহীন রক্তপাত বা নিষ্ঠুরতা নয়। এটি মূলত সৃষ্টিকর্তার প্রতি পরম আনুগত্য, মানবজাতির পুষ্টির জোগান এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার এক সুপরিকল্পিত এবং বাস্তবসম্মত ঐশ্বরিক বিধান।

প্রকৃতপক্ষে কোরবানি কি সত্যিই অমানবিক নাকি এটি মানবকল্যাণের এক অনন্য নিয়ামক তা বুঝতে হলে সামগ্রিক বাস্তবতার নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

পবিত্র কুরআনের সুরা নাহলের ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে চতুষ্পদ জন্তুগুলো মানুষের নানাবিধ উপকারের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন মানুষ এগুলো থেকে নিজেদের আহার্য ও শীত নিবারণের উপকরণ গ্রহণ করতে পারে। তবে পশুজবাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় পাশবিক কোনো আনন্দ বা নিছক রক্তপাতের কোনো স্থান ইসলামে নেই, যা সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে ‘আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তাকওয়া’ ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে। জেনুইন পশুর অধিকার রক্ষায় ইসলাম জবাইয়ের সময় সর্বোচ্চ দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে, যার প্রমাণ সহিহ মুসলিমের হাদিসে পাওয়া যায় যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছুরি অত্যন্ত ধারালো রাখা এবং এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই না করার কঠোর তাগিদ দিয়েছেন। পশুর প্রতি এই মাত্রার সংবেদনশীলতা আধুনিক কোনো প্রাণী অধিকার সনদেও এত সুচারুভাবে বর্ণিত হয়নি।

হানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও হালাল পদ্ধতি

পশুপ্রেমীরা প্রায়শই ইসলামিক উপায়ে পশু জবাইয়ের দৃশ্যকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে প্রচার করলেও আধুনিক বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চমকপ্রদ তথ্য উপাত্ত সামনে এনেছে। জার্মানির ঐতিহ্যবাহী হানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা বিভাগের খ্যাতনামা গবেষক অধ্যাপক উইলহেম শুলৎজে এবং তার সহকর্মী ড. হাজিম প্রাণীদের মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড স্থাপন করে হালাল জবাই এবং পশ্চিমা ‘স্টানিং’ বা মাথায় আঘাত করে অচেতন করার পদ্ধতির ওপর একটি দীর্ঘ তুলনামূলক গবেষণা পরিচালনা করেন। সেই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, সুনির্দিষ্ট হালাল পদ্ধতিতে ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত প্রধান রক্তনালী কেটে দেওয়ার ফলে প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পশুর মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে এবং সে কোনো ব্যথা অনুভব করে না। পক্ষান্তরে, পশ্চিমা যান্ত্রিক স্টানিং পদ্ধতিতে পশুর মস্তিষ্কে তীব্র যন্ত্রণার তরঙ্গ রেকর্ড করা হয়েছে যা প্রমাণ করে হালাল পদ্ধতিই প্রাণীর জন্য সবচেয়ে কম কষ্টদায়ক।

এ ছাড়া নিখুঁতভাবে হালাল উপায়ে জবাই করার ফলে পশুর শরীর থেকে সমস্ত দূষিত রক্ত সম্পূর্ণ নিষ্কাশিত হয়ে যায়, যা মাংসকে দীর্ঘক্ষণ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর রাখে।

বৈশ্বিক খাদ্যচক্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য

যদি বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে তাকানো হয়, তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতিদিন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রায় ২০ কোটি পশু-পাখি জবাই করা হয়। সেই তুলনায় মুসলিম উম্মাহর বার্ষিক কোরবানির মোট সংখ্যা এই বৈশ্বিক বাণিজ্যিক খামারের দৈনিক কাটতির চেয়েও অত্যন্ত নগণ্য একটি অংশ মাত্র। রেস্তোরাঁয় বসে প্রতিদিন যারা বাণিজ্যিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা মাংস অনায়াসে ভক্ষণ করছেন, তাদের কোরবানি এলে হঠাৎ ‘পশুপ্রেম’ জাগ্রত হওয়া এক ধরনের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিমুখিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। পুষ্টিবিজ্ঞানের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, প্রাণিজ প্রোটিন মানবদেহের অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রধান উৎস এবং বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জন্য এই কোরবানির গোশতই সারা বছরের একমাত্র উন্নত মানের পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোরবানির পশুর চামড়া, হাড় এবং উপজাত উপাদানসমূহ বিভিন্ন শিল্প ও জৈবসার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। গোশতের একটি বড় অংশ বাধ্যতামূলকভাবে সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম সামাজিক সাম্য ও মানবিক সহমর্মিতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। অতএব, কোরবানি কোনো অমানবিক মধ্যযুগীয় প্রথা নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ, পুষ্টির নিরাপত্তা এবং প্রকৃতির শাশ্বত খাদ্যচক্র সচল রাখার এক বিজ্ঞানসম্মত ও কল্যাণকামী ইবাদত।

banner
Link copied!