মার্কিন পুষ্টিবিদ হোরেস ফ্লেচার বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দাবি করেছিলেন, খাবার একেবারে তরল না হওয়া পর্যন্ত চিবানো উচিত। তার এই অদ্ভুত নিয়মের কারণে তিনি একটি পেঁয়াজ গিলে ফেলার আগে ৭২২ বার চিবিয়েছিলেন। ফ্লেচারের এই তত্ত্ব পুরোপুরি সঠিক না হলেও এর পেছনের মূল ধারণাটি এখন আধুনিক বিজ্ঞানে প্রমাণিত হচ্ছে।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডেন্টাল হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ম্যাটস ট্রুলসন জানিয়েছেন, চিবানোর প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের জন্য একটি গোপন পাম্প হিসেবে কাজ করে।
দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্যের সঙ্গে অ্যালঝেইমার এবং স্মৃতিভ্রংশের মতো ভয়াবহ রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকরা এখন `বাইট-ব্রেন অ্যাক্সিস` বা কামড় ও মস্তিষ্কের সম্পর্কের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ওরোফেসিয়াল নিউরোসায়েন্টিস্ট অভিষেক কুমার জানিয়েছেন, চিবানোর ক্ষমতার সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত পড়ে যাওয়া বা চিবানোর ক্ষমতা কমে গেলে তা মানুষের অ্যালঝেইমার রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।মানুষের চিবানোর এই অভ্যাস বিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপলজির গবেষক অ্যাডাম ভ্যান কাস্টেরেনের মতে, ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছর আগের আদিম মানুষের দাঁত ছিল বর্তমান যুগের বানরদের মতো। তখন তারা বনাঞ্চলের প্রচুর রসালো ফল খেত। কিন্তু বনাঞ্চল কমে আসায় যখন তাদের শক্ত বীজ ও শিকড় খেতে হলো, তখন বিবর্তনের ধারায় তাদের চোয়াল ও দাঁত বড় হতে শুরু করে।
আগুন আবিষ্কার ও রান্নার প্রচলন শুরু হওয়ার পর মানুষের দীর্ঘক্ষণ চিবানোর প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
আধুনিক মানুষ দিনে গড়ে মাত্র ৩৫ মিনিট খাবার চিবায়। অন্যদিকে শিম্পাঞ্জি ও বনোবোদের মতো প্রাণীরা প্রতিদিন সাড়ে চার ঘণ্টা এবং গরিলা ও ওরাংওটাংরা প্রায় ছয় ঘণ্টা চিবিয়ে কাটায়। নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার উট্রেখটের গবেষক আন্দ্রিস ভ্যান ডার বিল্ট জানান, চিবানোই হলো মানবদেহের হজমের প্রথম ধাপ।
খাবার চিবানোর সময় লালা এবং অ্যামাইলেজ এনজাইমের উৎপাদন বাড়ে, যা পাকস্থলীকে হজমের রস নিঃসরণের সংকেত দেয়।
খাবার না চিবিয়ে গিললে পাকস্থলী তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। খাবার ছোট টুকরো হলে পাচক রস আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। বড় টুকরো পেটে গেলে তা গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য অণুজীবদের বেশি সময় দেয়, যা পরবর্তীতে পেট ফাঁপা এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো মারাত্মক শারীরিক অস্বস্তি তৈরি করে।
২০০৯ সালের একটি গবেষণায় ১৩ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে ১০, ২৫ এবং ৪০ বার কাঠবাদাম চিবিয়ে খেতে বলা হয়েছিল।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা সবচেয়ে বেশি চিবিয়েছেন, তাদের শরীর বাদাম থেকে সবচেয়ে বেশি শক্তি শোষণ করেছে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণায় ২১ জনকে পিজ্জার টুকরো ১৫ এবং ৪০ বার চিবিয়ে খেতে দেওয়া হয়। বেশি চিবানো দলের অংশগ্রহণকারীদের শরীরে পরিপাক নিয়ন্ত্রণকারী সিসিকে এবং জিআইপি হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং ক্ষুধার হরমোন ঘ্রেলিন কমে যায়।
ফ্লেচার তার সময়ে হিসাব করে দেখিয়েছিলেন, সবাই ভালোভাবে খাবার চিবিয়ে খেলে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অন্তত ২২৭ গ্রাম কম খাবার গ্রহণ করবে।
এর ফলে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রতিদিন বর্তমান হিসেবে প্রায় এক কোটি ৯৫ লাখ ডলার বাঁচাতে পারত। পেট ভরে যাওয়ার সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছাতে শরীরের প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। ধীরে ধীরে চিবিয়ে খেলে মস্তিষ্ক এই সংকেত প্রক্রিয়াজাত করার পর্যাপ্ত সময় পায়।
জাপানের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ একসময় `কামিঙ্গু ৩০` নামে একটি প্রচারণা চালিয়ে নাগরিকদের প্রতি লোকমা অন্তত ৩০ বার চিবিয়ে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
ব্রাজিলে ৯২ জন শিশুর ওপর চালানো একটি জরিপে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের শিশুরা স্বাভাবিক ওজনের শিশুদের তুলনায় অনেক দ্রুত খাবার গিলে ফেলে। নরম ভাতের বদলে ওটমিলের মতো খাবার বেছে নিলে চিবানোর সময় বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
