বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

তাপাস সংস্কৃতির অন্দরমহল: স্প্যানিশদের মতো খাওয়ার নিয়মাবলি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২১, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

তাপাস সংস্কৃতির অন্দরমহল: স্প্যানিশদের মতো খাওয়ার নিয়মাবলি

স্প্যানিশ রন্ধনশৈলীর কথা উঠলেই সবার আগে যে খাবারটির নাম আসে, তা হলো ‍‍`তাপাস‍‍`। ছোট ছোট প্লেটে পরিবেশিত এই খাবারগুলো কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং স্পেনের প্রাণবন্ত সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাইকেলিন স্টার জয়ী বিখ্যাত শেফ হোসে আন্দ্রেস দীর্ঘ ৩৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও তার মন এখনো পড়ে আছে নিজ দেশ স্পেনের সুস্বাদু রান্নাবান্না ও খাবার সংস্কৃতির ওপর।

তার নতুন বই ‍‍`স্পেন মাই ওয়ে‍‍`-এর মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে বিবিসির সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেছেন তাপাস উপভোগের কিছু অসাধারণ টিপস।

হোসে আন্দ্রেসের মতে, তাপাস শুধু খাবার নয়, এটি স্প্যানিশ জীবনযাত্রার একটি আয়না। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি যখন প্রথম ‍‍`জালেও‍‍` নামের রেস্তোরাঁটি খোলেন, তখন অনেক গ্রাহকই শেয়ার করে খাওয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, তাপাস কেবল শেয়ারিং প্লেটই নয়, এটি একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়ার একটি চমৎকার মাধ্যম।

তিনি তাপাসকে স্প্যানিশ সংস্কৃতি বোঝার একটি ‍‍`ট্রোজান হর্স‍‍` হিসেবে অভিহিত করেন।

স্পেনের ১৭টি অঞ্চলের প্রতিটিতেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তাপাসের স্বাদ। ঐতিহ্যবাহী বার বা ‍‍`তাবেরনা‍‍`তে বসে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে ছোট প্লেটে খাবার খাওয়া স্প্যানিশদের প্রতিদিনকার অভ্যাসের অংশ। হোসে আন্দ্রেস মনে করেন, তাপাসের আসল স্বাদ পেতে হলে স্পেনে গিয়ে তাদের স্থানীয় পরিবেশেই খেতে হবে। তবে তাপাস উপভোগের ক্ষেত্রেও কিছু অলিখিত সামাজিক নিয়ম মেনে চলা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

আন্দ্রেসের পছন্দের উপায় হলো ‍‍`তাপেও‍‍` বা তাপাস ক্রল করা।

এক জায়গায় বসে পুরো খাবার শেষ না করে, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে অল্প করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এক জায়গায় পানীয় ও অল্প কিছু খাবার খেয়ে অন্য আরেকটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে আবার নতুন স্বাদের আস্বাদন করা—এটিই স্প্যানিশ ভোজনরীতির আসল আনন্দ। তিনি পরামর্শ দেন, নতুন কোনো রেস্তোরাঁয় গেলে আশপাশের লোকজন কী খাচ্ছে তা লক্ষ্য করা। যদি সবাই একই প্লেট খাচ্ছে, তবে সেটিই সম্ভবত সেই হাউসের স্পেশালিটি।

পানীয়র সাথে তাপাসের সঠিক মেলবন্ধনও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

শেফ জানান, স্প্যানিশরা সাধারণত খাবারের আগে খুব কড়া পানীয় পান করেন না। তবে তাপাসের সাথে সাদা বা লাল ওয়াইন, ঠান্ডা বিয়ার বা সিড্রা (আপেল থেকে তৈরি পানীয়) বেশ মানিয়ে যায়। স্পেনের বারগুলোতে বিয়ার পরিবেশন করা হয় ছোট গ্লাসে, যেন তা সর্বদা বরফ শীতল রাখা সম্ভব হয়। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই খাবারের অভিজ্ঞতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

খাবার টেবিলে সবাই মিলে হাত বাড়িয়ে খাবার নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মূল আনন্দ।

হোসে আন্দ্রেস বিশ্বাস করেন, খাবারের কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। ক্ষুধা পেলেই তাপাস উপভোগ করা যায়। তবে তার পরামর্শ, স্পেনের মূল ধ্রুপদী তাপাসগুলো যেমন—টরটিলা এস্পানিওলা (আলু ও পেঁয়াজের অমলেট), গামবাস আল আজিল্লো (রসুন ও তেলে ভাজা চিংড়ি) এবং পাতাতাস ব্রাভাস (ঝাল সসে ভাজা আলু) একবার অবশ্যই চেখে দেখা উচিত। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব স্বাদের ভিন্নতা তাদের রন্ধনশৈলীকে করেছে বৈচিত্র্যময়।

সংস্কৃতি এবং খাবারের এই মেলবন্ধনই স্প্যানিশদের জীবনকে করেছে আনন্দময়।

আপনি যখনই স্পেন ভ্রমণে যাবেন, তাদের স্থানীয় বারগুলোতে ঢুঁ মারতে ভুলবেন না। হোসে আন্দ্রেসের এই টিপসগুলো মেনে চললে আপনিও একজন স্থানীয়র মতোই তাপাস সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারবেন। খাবার টেবিলে বসে স্প্যানিশদের মতো করে আড্ডায় মেতে ওঠা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী স্বাদের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমেই মূলত দেশটির আত্মার সাথে একাত্ম হওয়া সম্ভব।

banner
Link copied!