রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয়: কখন ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে করণীয়: কখন ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঋতু বদলায় এবং সেই সঙ্গে বদলে যায় আকাশের রূপ। বাংলাদেশে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পরেই আসে কালবৈশাখীর গর্জন যা একদিকে যেমন তপ্ত ধরণীকে শীতল করে অন্যদিকে বয়ে আনে প্রাণঘাতী আতঙ্ক বজ্রপাত। প্রতি বছর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে যখন উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে মেঘ ধেয়ে আসে তখন সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। 

পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশের মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশই ঘটে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে। এর মধ্যে বৈশাখ মাসে অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বজ্রপাতের তাণ্ডব ও প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বছরের বাকি সময়টাতেও বজ্রপাত হয় তবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হওয়া ঝড়গুলোকে সাধারণত সাধারণ বজ্রঝড় হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতের সময়ে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যার দিকে ঝড়ের প্রবণতা বেশি থাকলেও পূর্বাঞ্চলে তা রাতের দিকে বেশি আঘাত হানে। আকাশে কালো মেঘ বা মেঘের গর্জনের তীব্রতা দেখে সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগেই একটি ঝড়ের আভাস পাওয়া সম্ভব। 

বিশেষজ্ঞদের মতে খোলা জায়গায় মানুষের উপস্থিতি এবং অসচেতনতাই বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষক জেলে বা উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষেরা এই ঝড়ের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে হলে কেবল ঘরের ভেতরে থাকাই যথেষ্ট নয় বরং ঘরের ভেতরেও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

বজ্রঝড় শুরু হলে সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো কোনো দালান বা কংক্রিটের মজবুত ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া। অনেক সময় আমরা মনে করি গাছের নিচে দাঁড়ালে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে কিন্তু বজ্রপাতের সময় উঁচু গাছই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ আকর্ষণ করে। তাই ঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই ভবনের ছাদ বা উঁচু স্থান ত্যাগ করে সমতলে ফিরে আসা শ্রেয়। বাড়িতে অবস্থান করলে জানালার কাছাকাছি কিংবা বারান্দায় থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। 

বজ্রপাতের সময় জানালার কাঁচের সংস্পর্শ এড়াতে জানালা বন্ধ রাখা উচিত এবং ঘরের ভেতরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে মোবাইল ল্যাপটপ কম্পিউটার ল্যান্ডফোন এবং টেলিভিশনের মতো যন্ত্রগুলো পুরোপুরি বন্ধ রাখা এবং প্লাগ খুলে রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

যানবাহনে চলাচলরত অবস্থায় যদি বজ্রপাত শুরু হয় তবে গাড়ির ধাতব অংশের সাথে শরীরের সরাসরি সংযোগ ঘটানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সম্ভব হলে গাড়িটি নিরাপদ কোনো ছাউনির নিচে পার্ক করে রাখতে হবে। বাইরে বের হওয়ার সময় যদি আবহাওয়া প্রতিকূল মনে হয় তবে অবশ্যই রাবারের জুতা পরিধান করা উচিত যা মাটির সাথে শরীরের সরাসরি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিদ্যুৎ প্রবাহের ঝুঁকি কমায়। 

ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা বজ্রপাতের সময় তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করতে পারে তাই প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করাই নিরাপদ। যদি কেউ খোলা মাঠে আটকা পড়েন এবং আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে তবে মাটির ওপর শুয়ে না পড়ে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। কানে আঙুল দিয়ে শব্দরোধী অবস্থা তৈরি করা এবং মাথা নিচু রাখা এক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।

জলাশয়ে থাকা জেলেরা এই দুর্যোগের সময় চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হন। বজ্রপাতের আভাস পাওয়া মাত্রই নৌকা নিয়ে তীরের কাছাকাছি আসা অথবা নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত। বাড়ির ভেতরেও সতর্কতা হিসেবে ধাতব কল বা সিঁড়ির ধাতব রেলিং স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ বজ্রপাত ভবনের পাইপলাইনের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

কোনো বাড়িতে যদি বজ্রপাত প্রতিরোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকে তবে সবাই এক ঘরে ভিড় না করে আলাদা আলাদা কক্ষে ছড়িয়ে থাকা ভালো। যদি দুর্ভাগ্যবশত কেউ বজ্রপাতে আহত হন তবে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয় নেই বরং তাকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা জরুরি।

পরিবেশবিদদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা নয় বরং একটি জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামগঞ্জে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তাল গাছ রোপণের মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তিকে থামানোর সাধ্য মানুষের নেই কিন্তু সঠিক জ্ঞান ও সতর্কতা অবলম্বন করলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যদেরও এই বিষয়ে সচেতন করা যাতে বজ্রপাতের মতো ঘাতক দুর্যোগ থেকে জীবন রক্ষা পায়।

banner
Link copied!