রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

চলায় ফেরায় ছোট ছোট আমল: মিজানের পাল্লা ভারী করার সহজ উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

চলায় ফেরায় ছোট ছোট আমল: মিজানের পাল্লা ভারী করার সহজ উপায়

মানুষের জীবন এক নিরন্তর পথচলা। প্রতিদিনের প্রয়োজনে আমাদের ঘর থেকে বের হতে হয় এবং বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই যাতায়াতকে সাধারণ কাজ মনে হলেও একজন মুমিনের জন্য এটি বিপুল সওয়াব বা নেকি অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সঃ আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আমাদের প্রতিটি কদমকে ইবাদতে পরিণত করা যায়। ছোট ছোট কিছু কাজ যা করতে কোনো বাড়তি পরিশ্রম বা সময়ের প্রয়োজন হয় না, অথচ কিয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় এগুলোই পাহাড় সমান নেকি হয়ে দেখা দিতে পারে। ইসলামের সৌন্দর্যের একটি বড় দিক হলো এটি মানুষের প্রাত্যহিক চলার পথকেও আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

চলার পথে সবচেয়ে সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় যদি কোনো পাথর, কাঁটা, গাছের ডাল বা এমন কিছু চোখে পড়ে যা মানুষের বা যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, তবে তা সরিয়ে দেওয়া ঈমানের একটি অংশ। রাসুল সঃ বলেছেন যে ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে এবং তার মধ্যে সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা (সহীহ মুসলিম, ৩৫)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে যে এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল পড়ে থাকতে দেখে তা সরিয়ে ফেলল, মহান আল্লাহ তার এই কাজ কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন (সহীহ আল-বুখারী, ২৪৭২)। এই ছোট কাজটির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।

আরেকটি চমৎকার আমল হলো চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেওয়া। রাস্তা দিয়ে চলার সময় কোনো মুসলিম ভাইয়ের সাথে দেখা হলে তাকে আগে সালাম দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুল সঃ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ইসলামের কোন কাজগুলো সবচেয়ে উত্তম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং যাকে চেনো আর যাকে চেনো না সবাইকে সালাম দেওয়া (সহীহ আল-বুখারী, ৬২৩৬)। সালাম কেবল একটি অভিবাদন নয় বরং এটি একে অপরের জন্য দোয়া। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি করে। অথচ বর্তমানে আমরা কেবল পরিচিতদের সালাম দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যা সুন্নাহর পরিপূর্ণ চেতনার পরিপন্থী।

চলার পথে হাসি মুখে কথা বলা বা কারো দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও একটি সাদাকার সওয়াব বয়ে আনে। রাসুল সঃ বলেছেন তোমার ভাইয়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে তোমার মুচকি হাসিও একটি সাদাকা (সুনান আত-তিরমিযী, ১৯৫৬)। চলার পথে মানুষের সাথে কঠোর আচরণ না করে নরম ও দয়ালু হওয়া ইসলামের শিক্ষা। এছাড়া যদি কেউ পথ হারিয়ে ফেলে তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেওয়া বা কোনো অন্ধ বা দুর্বল ব্যক্তিকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করাও বিশাল সওয়াবের কাজ। রাসুল সঃ-এর শিক্ষা অনুযায়ী এই ছোট ছোট পরোপকারগুলো আমাদের আমলনামায় সাদাকার সওয়াব হিসেবে জমা হতে থাকে।

দৃষ্টিনত রাখা বা গযবুল বাসার হলো পথ চলার অন্যতম আদব যা কুরআন ও হাদিসে বারবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পথে চলার সময় নিষিদ্ধ কোনো বস্তুর দিকে নজর না দেওয়া এবং নিজের দৃষ্টিকে সংযত রাখা একজন মুমিনের পরিচয়। মহান আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে (সূরা আন-নূর, ২৪:৩০)। এটি কেবল একটি আমল নয় বরং এটি মানুষের চরিত্রকে রক্ষা করার একটি ঢাল। এর পাশাপাশি উচ্চস্বরে কথা বলা বা দম্ভভরে চলাফেরা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কুরআন মাজীদের লোকমান হাকিমের উপদেশের মধ্যে এসেছে যে পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো।

সবশেষে পথ চলার সময় জিকির ও ইস্তিগফার করা একটি মহৎ আমল হতে পারে। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ার জন্য কোনো বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। হাঁটার সময় মনে মনে আল্লাহর জিকির করলে সময়ের যেমন সঠিক ব্যবহার হয় তেমনি প্রতি কদমে নেকি অর্জিত হয়। রাসুল সঃ সবসময় আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন। আমরা যদি এই সুন্নাহগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চর্চা করি তবে আমাদের ঘর থেকে বের হওয়া এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পুরো সময়টি একটি ইবাদতের সময় হিসেবে গণ্য হবে। এই ছোট ছোট আমলগুলোই পরকালে আমাদের নাজাতের উসিলা হতে পারে।

banner
Link copied!