বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা’র পক্ষ থেকে এআই স্টার্টআপ ‘ম্যানাস’ অধিগ্রহণের ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি বড় চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করেছে চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি)। বেইজিংয়ের এই নজিরবিহীন ভেটো মূলত উন্নত প্রযুক্তি এবং মেধাস্বত্ব বিদেশে পাচার হওয়া রোধ করার একটি কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আল-জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে মেটার নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও চীন সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো এআই স্টার্টআপের বিদেশি অধিগ্রহণ বর্তমানে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ম্যানাস মূলত সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান হলেও এর প্রতিষ্ঠাতা এবং কারিগরি শিকড় চীনে অবস্থিত। কোম্পানিটি এমন উন্নত ‘এআই এজেন্ট’ তৈরি করে যা প্রচলিত চ্যাটবটের মতো বারবার নির্দেশনা ছাড়াই স্বাধীনভাবে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারে। মেটা গত ডিসেম্বর মাসে এই প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল যাতে তাদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ প্ল্যাটফর্মে এআই সক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়। মার্ক জাকারবার্গের এআই ভিশনের জন্য এই অধিগ্রহণটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। তবে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিভা এবং উদ্ভাবন মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাওয়া ঠেকাতেই এই আইনি বাধা প্রদান করা হয়েছে।
চীনের আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে এনডিআরসি সেই ক্ষমতারই প্রয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ম্যানাসের ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছিল এবং অভিযোগ রয়েছে যে মেটার অধিগ্রহণ পর্যালোচনার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে দেশ ত্যাগেও বাধা দেওয়া হয়েছে। চীনের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সরবরাহ সীমিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যা বেইজিংকে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটা দাবি করেছে যে তারা ম্যানাস অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা বেইজিংয়ের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আইনি সমাধান খুঁজছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন যে চীনের এই পদক্ষেপ কেবল একটি চুক্তি বাতিল নয় বরং এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে একটি সংকেত। আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে টিকটক নিয়ে যে ধরণের জটিলতা তৈরি হয়েছিল এখন মেটার এই চুক্তি স্থগিত হওয়া সেই একই ধরণের ‘টেক কোল্ড ওয়ার’ বা প্রযুক্তি শীতল যুদ্ধের প্রতিফলন। বেইজিংয়ের মতে ম্যানাসের তৈরি ‘পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়’ এজেন্ট প্রযুক্তিটি কেবল বাণিজ্যিক নয় বরং কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত মূল্যবান।
হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং জানিয়েছে যে তারা মার্কিন এআই কোম্পানিগুলোর মেধাস্বত্ব রক্ষায় সজাগ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন এআই মডেল নকল করার চেষ্টা করছে যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলবে। মেটা এবং ম্যানাসের এই স্থগিত হয়ে যাওয়া চুক্তি প্রমাণ করছে যে প্রযুক্তি এখন আর কেবল একটি ব্যবসায়িক পণ্য নয় বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে এআই খাতে বড় ধরণের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
