শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

এক হাসিতে বিশ্বজয়: ট্রাকের হেলপার থেকে স্কুলের বারান্দায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ১১:৫১ পিএম

এক হাসিতে বিশ্বজয়: ট্রাকের হেলপার থেকে স্কুলের বারান্দায়

গায়ে কিছুটা ময়লা শার্ট, এক হাতে চায়ের কাপ আর চোখে-মুখে পৃথিবী জয় করা এক খণ্ড বিশাল হাসি। মুম্বাইয়ের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণ খুলে হাসতে থাকা এক কিশোরের এই দৃশ্যটি গত কয়েক বছরে ইন্টারনেটের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনো নিয়মিত ব্যবহারকারী নেই যিনি এই দৃশ্যটি কোনো মিম, ট্রল বা রিলসে দেখেননি। হাসতে হাসতে অরুণের হাতের কাপ থেকে চা পড়ে যাওয়ার সেই দৃশ্যটি কেবল একটি ভিডিও ছিল না, বরং তা ছিল এক চরম দারিদ্র্যের মাঝেও বেঁচে থাকার আনন্দ প্রকাশের এক অনন্য দলিল। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে হাসানো সেই কিশোরের নাম অরুণ কুমার, যার জীবনের গল্প এখন যে কারো জন্য বড় ধরণের অনুপ্রেরণা হতে পারে।

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া অরুণের শৈশব মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে চতুর্থ শ্রেণির পর আর স্কুলের বারান্দায় পা রাখা হয়নি তার। পেটের দায়ে খুব অল্প বয়সেই তাকে নামতে হয় জীবনযুদ্ধে। শুরু করেন ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ করা। দিনের পর দিন মুম্বাইয়ের ঘিঞ্জি রাস্তা আর হাইওয়েতে ট্রাকের চাকা আর ইঞ্জিনের সাথেই কেটেছে তার সময়। নেহেরু নামের এক ট্রাক চালকের সাথে কাজ করতেন অরুণ, যাকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে ‘নেহেরু আন্না’ বলে ডাকতেন। চালক নেহেরুও এই ছোট ছেলেটিকে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন এবং কাজ শেষে প্রায়ই তাকে নিয়ে গল্পে মেতে উঠতেন।

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল সাধারণ একটি কর্মব্যস্ত দিন। ট্রাক ধুয়ে-মুছে সবে কাজ শেষ করেছে অরুণ। পরিশ্রান্ত অরুণের হাতে এক কাপ চা তুলে দিয়ে নেহেরু তাকে একটি কৌতুক শোনান। সেই সাধারণ কৌতুক শুনে অরুণের যে অকৃত্রিম ও মনখোলা হাসির সৃষ্টি হয়েছিল, নেহেরু তা নিজের মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে নেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি আপলোড করার পরপরই তা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অরুণের সেই হাসি কেবল সাধারণ নেটিজেনদেরই নয়, বরং ভারতের রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নজর কাড়তে সক্ষম হয়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরই অরুণের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় যা তাকে ট্রাকের হেলপার থেকে পুনরায় শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনে।

সরকারি সহায়তায় এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে অরুণকে পুনরায় স্কুলে ভর্তি করা হয়। গত কয়েক বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে অরুণ তার পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং আগামী বছর তার এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অরুণের স্বপ্ন অনেক বড়। তিনি কেবল স্কুল শেষ করেই থেমে থাকতে চান না, বরং গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান। ট্রাকের হেলপার থেকে একজন শিক্ষিত নাগরিক হয়ে ওঠার এই যে রূপান্তর, তা প্রমাণ করে যে একটি সুযোগ মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে।

জীবনের এই নতুন পর্যায়ে এসেও অরুণ তার পুরনো দিনগুলোকে ভুলে যাননি। বিশেষ করে তার দুঃসময়ের সঙ্গী ‘নেহেরু আন্না’র প্রতি তার কৃতজ্ঞতা আজীবন অটুট। অরুণের মতে তার এই বর্তমান অবস্থানের পেছনে নেহেরুর সেই একটি সাধারণ ভিডিও রেকর্ডিং এবং তার প্রতি অকৃত্রিম স্নেহের অবদান অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে বড় কোনো পেশায় নিয়োজিত হলেও তিনি তার এই পুরনো গুরুকে পাশে রাখতে চান। অরুণের গল্প আমাদের শেখায় যে জীবনের চরম অন্ধকারেও হাসি থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়, কারণ সেই এক ফালি হাসিই হয়তো নিয়ে আসতে পারে পৃথিবীর সমস্ত আলো।

banner
Link copied!