সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

যুদ্ধ ও তীব্র গরমে ইরানে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, জনজীবন অতিষ্ঠ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

যুদ্ধ ও তীব্র গরমে ইরানে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, জনজীবন অতিষ্ঠ

ছবি : সংগৃহীত

আল জাজিরা সংবাদমাধ্যমের একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ এবং সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হামলার কারণে ইরানের জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। দেশজুড়ে চলমান এই অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার মালিকরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে ভেঙে পড়া এই অবকাঠামো সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে।

রাজধানী তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরান এবং মঈন জানান, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় তীব্র গরমে প্রায় ১৮০ কেজি আইসক্রিম গলে যাওয়ায় একজন বিক্রেতা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। কামরান জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ৩৮টি চূড়ান্ত পরীক্ষা আগামী মাস পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। মঈনের মতে, এই সংকট কেবল পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যেসব রোগী বাড়িতে ভেন্টিলেটরের ওপর নির্ভরশীল অথবা যাদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ফ্রিজে রাখতে হয়, তাদের জন্য এই লোডশেডিং আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধের ঠিক আগে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলীআবাদী দেশবাসীকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ এবং দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন সামরিক হামলার পর সেই প্রতিশ্রুতি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তেহরান সিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেহেদি চামরান আকস্মিক এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, দেশের বহু বৈদ্যুতিক স্থাপনায় সম্প্রতি বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল্লাহদাদ এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, গ্রিডের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কমে গেছে এবং পুরো নেটওয়ার্কের ২ হাজারের বেশি স্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কিশ দ্বীপের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরাসরি মার্কিন হামলা এবং বান্দর আব্বাস, জাস্ক ও চাবাহার এলাকার বিতরণ নেটওয়ার্কে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আল জাজিরার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানের ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের পচনশীল পণ্য বাঁচাতে পদচারী-সেতু ও ফুটপাতে শব্দদূষণকারী পোর্টেবল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। শহরের বড় ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলো বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে আছে এবং ট্রাফিক সিগন্যাল কাজ না করায় মোড়গুলোতে পুলিশ সদস্যদের হাতে ইশারা করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। তবে হাসপাতালগুলো নিজস্ব বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সচল রেখেছে, যদিও তাদের চারপাশের পুরো এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকছে।

অর্থনীতিবিদ ও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাহমান আরমান এই সংকটের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, রমজান মাসের যুদ্ধের সময় মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ গ্রাহক মোবারকেহ স্টিল কোম্পানি এবং খুজেস্তান স্টিল কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এই দুটি কারখানা বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু একই সময়ে মাহশহর পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সেও বোমা হামলা হয়, যা আগে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করত। ফলে উদ্বৃত্তের বদলে ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

অধ্যাপক আরমান আরও জানান, যুদ্ধ কেবল পরিস্থিতিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু মূল সমস্যা হলো দীর্ঘদিনের সঞ্চালন লাইনের জরাজীর্ণ অবস্থা। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বখতিয়ারি বাঁধের মতো বড় প্রকল্পের কাজ শেষ করতে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন। ইরান চেম্বার অব কমার্স, ইন্ডাস্ট্রিজ, মাইনস অ্যান্ড এগ্রিকালচারের সাবেক প্রধান হোসেইন সেলাহভারজি সতর্ক করে বলেছেন, শিল্প অঞ্চলগুলো প্রতিদিন চার থেকে ছয় ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতকে পঙ্গু করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে।

banner
Link copied!