রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ইসলামি জীবন ও সঠিক পথনির্দেশ: কাদের পরামর্শে মিলবে পরকালীন মুক্তি?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

ইসলামি জীবন ও সঠিক পথনির্দেশ: কাদের পরামর্শে মিলবে পরকালীন মুক্তি?

মানবজীবনের প্রকৃত সাফল্য এবং পরকালীন মুক্তি সম্পূর্ণভাবে বিশুদ্ধ ঈমানের ওপর নির্ভরশীল। একজন মুসলিমের জন্য তার ঈমান ও আমলকে শরিয়তের সঠিক ছাঁচে গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক। তবে বর্তমান যুগে তথ্যের ব্যাপক প্রচার ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে দ্বিনি অনেক বিষয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিষয়ে ঈমান স্থাপন বা আমল করার আগে অবশ্যই সেই তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও উৎস বিচার করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি যদি শরিয়তের নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হন, তবে তার আবেগপ্রসূত কথায় ঈমান সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। দ্বিনি বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট পরম্পরা রয়েছে যা ইসলামি ইতিহাসের শুরু থেকেই স্বীকৃত।

এই পরম্পরায় মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য দল হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তারা সরাসরি ওহির অবতরণ দেখেছেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে সরাসরি দ্বিন শিক্ষা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসায় বলেছেন যে, যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা জানে যে তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাই সত্য এবং এটি পরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর পথনির্দেশ করে (সূরা সাবা, ৩৪:৬)। তাফসিরবিদদের মতে এই আয়াতে সাহাবাদের জ্ঞানের গভীরতা ও তাদের সত্যনিষ্ঠার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সুতরাং ঈমান ও ইসলামের মৌলিক প্রশ্নে সাহাবাদের আমল ও বক্তব্যই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।

সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী স্তরে যাদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা স্বীকৃত, তারা হলেন তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িগণ। হাদিসে বর্ণিত ‘খাইরুল কুরুন’ বা সর্বোত্তম যুগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তাদের ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদ উম্মাহর জন্য আলোকবর্তিকা। ইমাম ইবনে আবি হাতিম রাহিমাহুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সাহাবাদের পর তাবেয়িরাই তাদের যোগ্য স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাদের মনোনীত করেছিলেন দ্বিন প্রতিষ্ঠার জন্য এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত ও শরিয়তের সীমানা রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে। তারা সাহাবাদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানকে সুসংবদ্ধ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমানত হিসেবে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই দ্বিনি সূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে তাদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়।

তাবে-তাবেয়িদের পরবর্তী যুগে অর্থাৎ বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলামি শরিয়তের বিশদ ব্যাখ্যা প্রদানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মুজতাহিদ ইমাম ও বিজ্ঞ আলেম সমাজ। ইমাম শাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহর মতে সাহাবিরা জ্ঞান, ইজতিহাদ, আল্লাহভীতি ও প্রজ্ঞায় আমাদের চেয়ে অনেক উঁচুতে অবস্থান করেন এবং তাদের মতামত আমাদের নিজস্ব মতামতের চেয়ে অনেক বেশি প্রশংসনীয়। একইভাবে বর্তমান যুগেও যারা নিষ্ঠার সঙ্গে সাহাবিদের অনুসরণ করেন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন (সূরা তাওবা, ৯:১০০)। দ্বিনি বিষয়ে কোনো সংকটের সমাধান খুঁজতে হলে অবশ্যই সেই সব আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে যারা কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের মানহাজের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তিগত যুক্তি বা নব্য আবিষ্কৃত মতবাদের চেয়ে পূর্ববর্তী ইমামদের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হচ্ছে নিরাপদ পথ।

উল্লেখ্য যে ঈমান সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের যুগেই চূড়ান্ত ও মীমাংসিত হয়ে গেছে। পরবর্তী যুগের ইমামরা কেবল শাখাগত বা সমকালীন সমস্যাগুলোর সমাধান দিয়ে গেছেন। তাই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ঈমানের মৌলিক ভিত্তি বা স্বীকৃত কোনো শাখাগত বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা বা বিতর্ক সৃষ্টি করার কোনো অবকাশ নেই। একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য নিরাপদ হলো বিজ্ঞ মুফতি ও হক্কানি আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা। মনে রাখতে হবে যে দ্বিনি জ্ঞান কেবল তথ্যের সমাহার নয় বরং এটি একটি নুর যা সঠিক শিক্ষক ও পরম্পরা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই পরকালীন মুক্তির স্বার্থে পরামর্শদাতার যোগ্যতা বিচার করা অপরিহার্য।

banner
Link copied!