আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহর দিকে রওনা হওয়া মানে কেবল একটি ভৌগোলিক ভ্রমণ নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, আজীবনের গোনাহ থেকে তওবা করে ফিরে আসা এবং পরম রবের নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। ইসলামি শরিয়তে হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং এটি সামর্থ্যবান মুমিনদের ওপর জীবনে একবার ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর বিধান ওই ঘরের হজ করা, যার আছে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)। তবে এই মহান ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। হজের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও এর আধ্যাত্মিক মহিমা রক্ষা করা বেশি জরুরি। অনেক সময় আমাদের কিছু অসতর্ক কাজ বা আচরণের কারণে হজের বিশাল সওয়াব ও মহিমা ক্ষুণ্ণ হয়ে যায়।
হজ মকবুল বা গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রধান শর্ত হলো হজের সফরে যাবতীয় গুনাহ ও অনর্থক কাজ থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা। সূরা বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হজের নির্দিষ্ট মাসগুলোতে যারা ইহরাম বাঁধবে, তারা যেন কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয়, কোনো গুনাহ না করে এবং কোনো প্রকার ঝগড়া-বিবাদেও না জড়ায়। এই আয়াতের আলোকেই মুফাসসিরগণ হজের মহিমা নষ্টকারী কাজগুলো চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো অশ্লীলতা থেকে মুক্ত থাকা। ইহরাম অবস্থায় সরাসরি কোনো বড় পাপে লিপ্ত না হলেও বর্তমান যুগে স্মার্টফোন বা ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার হাজিদের অজান্তেই গুনাহের পথে নিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনর্থক সময় কাটানো বা পরিবারের সঙ্গে আলাপে মেজাজ হারিয়ে কটু শব্দ ব্যবহার করা হজের পবিত্রতা নষ্ট করে।
নজরের হেফাজত করা হজের সফরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে কাবা শরিফ পর্যন্ত প্রতিটি পদে পদে হাজিদের নজরের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। পরনারীর দিকে কুদৃষ্টি দেওয়া বা হারাম কিছু দেখা হজের রুহানিয়তকে মুহূর্তেই শেষ করে দেয়। অথচ মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো তারা সর্বাবস্থায় তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে (সুরা নুর: ৩০)। হজের মতো পবিত্র সফরেও অনেকে নিজেদের চিরাচরিত গিবত বা পরনিন্দার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেন না। এজেন্সি, কাফেলা বা সহযাত্রীদের ছোটখাটো ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করা গিবতের শামিল, যা হাদিসের ভাষ্যমতে ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য গুনাহ। এই সফরের প্রতিটি মুহূর্ত জিকির ও ইস্তেগফারে কাটানো উচিত ছিল, সেখানে গিবত করা হজের মহিমাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অহংকার বর্জন করা। হজের সফরে অনেক সময় ভিড়, গরম বা অব্যবস্থাপনার কারণে হাজিরা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন এবং নিজেদের সামাজিক পদমর্যাদা বা আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে অন্যের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। মনে রাখা উচিত, ইহরামের সাদা দুই টুকরো কাপড় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। অহংকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ পছন্দ করেন না (সুরা নাহল: ২৩)। একইসঙ্গে লোকদেখানো ইবাদত বা ‘রিয়া’ থেকেও বেঁচে থাকা জরুরি। বর্তমান সময়ে হজের সফরে গিয়ে অত্যধিক সেলফি তোলা বা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করার প্রবণতা হাজিদের একাগ্রতা নষ্ট করছে। ইবাদতের চেয়ে ছবি তোলায় বেশি মনোযোগী হওয়া ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।
পরিশেষে, হজের সফরে ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি বা লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে সহযাত্রীদের সঙ্গে তর্ক করা কোরআনের নির্দেশনার পরিপন্থী। এছাড়া হজে গিয়ে অনেকের হাত পাতার বা ভিক্ষাবৃত্তির অভ্যাস দেখা যায়, যা একজন সামর্থ্যবান হাজির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং ইবাদতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী। হজের এই সফরে পাথেয় হিসেবে সবচেয়ে উত্তম হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি। যার মনের অবস্থা যত বেশি আল্লাহমুখী হবে এবং যিনি যত বেশি এই ক্ষুদ্র ভুলগুলো থেকে বেঁচে থাকবেন, তার হজ তত বেশি মকবুল হওয়ার আশা রাখা যায়।
