ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে দেখা যায়, যুগে যুগে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তৎকালীন শাসকেরা নানামুখী নিষ্ঠুর কৌশল অবলম্বন করেছে। কখনো অর্থনৈতিক শোষণ, কখনো সাংস্কৃতিক দমন, আবার কখনো চরম পর্যায়ের সহিংসতা চালিয়ে তারা তাদের গদি অটুট রাখার অপচেষ্টা চালাতো। কারো কারো কৌশল এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, সেগুলোকে ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ফেরাউনের শিশু হত্যার রাজনীতি। মিসরের তৎকালীন বাদশা ফেরাউনের সেই পদক্ষেপ শুধু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল একটি উদীয়মান জাতিকে সমূলে দুর্বল করে নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা রক্ষা করা।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরাউন ছিল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের একটি উপাধি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়। কিবতি বংশীয় এই সম্রাটরা কয়েক শতাব্দীব্যাপী মিসর শাসন করেছেন, যার ফলে মিসরীয় সভ্যতা ও বিজ্ঞানের চূড়ায় পৌঁছেছিল। তবে মুসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে জালিম। গবেষক লুইস গোল্ডিংয়ের মতে, সেই জালিম ফেরাউনের নাম ছিল দ্বিতীয় রামাসিস এবং পরবর্তীতে লোহিত সাগরে ডুবে মরা ফেরাউন ছিল তার পুত্র মারনেপতাহ। ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত তার মমি আজও সেই উদ্ধত শাসকের শোচনীয় পরিণতির সাক্ষ্য বহন করে।
ফেরাউনের এই বীভৎস রাজনীতির সূত্রপাত ঘটেছিল একটি স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের দিক থেকে একটি আগুন এসে মিসরের মূল অধিবাসী কিবতিদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ অভিবাসী বনু ইসরাঈলরা অক্ষত রয়েছে। দেশের বড় বড় জ্যোতিষী ও জাদুকররা এর ব্যাখ্যায় বলেছিল যে, বনু ইসরাঈলের মধ্যে এমন এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যার হাতে ফেরাউনের সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে। এই ভবিষ্যৎবাণী ফেরাউনকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং তিনি সেই সম্ভাব্য সন্তানের জন্ম রোধের কৌশল হিসেবে বনু ইসরাঈলদের নবজাত সকল পুত্র সন্তানকে ব্যাপকহারে হত্যার নির্দেশ দেন।
ফেরাউনের এই পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও কপট। তিনি চেয়েছিলেন এভাবে হত্যা করতে থাকলে এক সময় বনু ইসরাঈল কওম যুবকশূন্য হয়ে যাবে, বৃদ্ধরা মারা যাবে এবং মহিলারা দাসীবৃত্তিতে বাধ্য হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারাদেশে একদল ধাত্রী ও জল্লাদ নিয়োগ করা হয়। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের তালিকা করত এবং সন্তান প্রসবের পর ছেলে হলে তাকে মায়ের সামনেই জবাই করে ফেলত। পবিত্র কোরআনে এই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ হয়েছে, “এবং (সেই সময়কেও স্মরণ করো), যখন আমি তোমাদেরকে ফেরাউনের লোকজন থেকে মুক্তি দেই, যারা তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিচ্ছিল। তোমাদের পুত্রদেরকে জবাই করে ফেলছিল এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখছিল। আর এই যাবতীয় পরিস্থিতিতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছিল মহা পরীক্ষা।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৯)।
তবে ফেরাউনের এই রক্তক্ষয়ী রাজনীতির মধ্যেও মহান আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তিনি ঠিকই সেই হত্যাযজ্ঞের মাঝেই নবী মুসা (আ.)-কে দুনিয়াতে পাঠালেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে মুসাকে হত্যার জন্য হাজার হাজার শিশুকে জবাই করা হয়েছিল, আল্লাহ সেই মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের নিজের ঘরেই রাজকীয় নিরাপত্তায় লালিত-পালিত হওয়ার ব্যবস্থা করেন। কোরআনের এই ঘটনা আমাদের সামনে কয়েকটি গভীর শিক্ষা উন্মোচন করে। প্রথমত, স্বৈরশাসকরা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ধ্বংস করতে পিছপা হয় না। দ্বিতীয়ত, নিরপরাধ মানুষের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কখনোই টেকসই হয় না। পরিশেষে, আল্লাহর বিচার অবশ্যম্ভাবী এবং জুলুম যত প্রবলই হোক না কেন, তার শোচনীয় পতন অনিবার্য। ফেরাউনের এই ইতিহাস কেবল একটি গল্প নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি শাসকের জন্য এক সতর্কবাণী।
