গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টায় থাকা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ (GSF)-র একটি বিশাল বহর গ্রিসের উপকূলে মাঝ সমুদ্রে আটকে দিয়েছে ইসরায়েলি নৌবাহিনী। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের অদূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই অভিযান চালানো হয়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী অন্তত ২২টি নৌকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং ১৭৫ জন কর্মীকে আটক করে ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের দিকে নিয়ে গেছে। ফ্লোটিলার আয়োজকরা এই ঘটনাকে সরাসরি ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কারণ এই অভিযানটি গাজা থেকে প্রায় ৯৬৫ কিলোমিটার দূরে সংঘটিত হয়েছে।
বুধবার গভীর রাতে চালানো এই অভিযানে ইসরায়েলি নৌবাহিনী স্পিডবোট এবং ড্রোন ব্যবহার করে পুরো বহরটিকে ঘিরে ফেলে। আয়োজক সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি কমান্ডোরা ভারী অস্ত্র প্রদর্শন করে কর্মীদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। এসময় তারা নৌকার ইঞ্জিনগুলো অকেজো করে দেয় এবং বহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে বাকি থাকা নৌকাগুলো সমুদ্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে একটি বিশাল সামুদ্রিক ঝড় এগিয়ে আসার মুখে বিদ্যুৎবিহীন ও ইঞ্জিনহীন নৌকাগুলোতে শত শত বেসামরিক মানুষকে ফেলে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই ফ্লোটিলাটি ছিল মূলত একটি ‘প্রচারণামূলক নাটক’। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, আটককৃত নৌকাগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে মাদক এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পাওয়া গেছে। এছাড়াও ইসরায়েল অভিযোগ করেছে যে, এই ফ্লোটিলার আয়োজকরা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে যোগসাজশ করছে। তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপকে বাধাগ্রস্ত করতেই এই সময়ে ফ্লোটিলাটি পাঠানো হয়েছে। তবে আয়োজকরা ইসরায়েলের এই সব অভিযোগকে ‘হাস্যকর ও বানোয়াট’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং আটক হওয়া ২৪ জন ইতালীয় নাগরিককে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক নৌ-আইন মেনে চলার জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানান। একইভাবে স্পেন সরকারও এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং মাদ্রিদে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতকে তলব করেছে। গ্রিস সরকার জানিয়েছে, এই অভিযানটি গ্রিসের আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে আন্তর্জাতিক এলাকায় ঘটেছে এবং ইসরায়েল এ বিষয়ে আগে থেকে তাদের সাথে কোনো আলোচনা করেনি।
গাজায় বর্তমানে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় চলছে, তা নিরসনেই এই ফ্লোটিলাটি পাঠানো হয়েছিল। গত দুই সপ্তাহ আগে স্পেন, ফ্রান্স এবং ইতালি থেকে প্রায় ৫৮টি নৌকা নিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়। এর আগে গত অক্টোবর মাসেও এই একই গোষ্ঠীর একটি বহর ইসরায়েল আটকে দিয়েছিল, যেখানে পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ কয়েকশ কর্মীকে বন্দি করা হয়েছিল। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজার ২১ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং উত্তরাঞ্চলীয় গাজা সিটিতে ইতিমধ্যেই দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে সেখানে জীবন রক্ষাকারী ঔষধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইইউ মুখপাত্র আনোয়ার এল আনৌনি বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক নৌযান আটক করা আইনত অগ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ও কর্মী তারিক রউফ বিবিসি অ্যারাবিককে জানিয়েছেন যে, কর্মীদের মনোবল এখনও চাঙ্গা রয়েছে এবং তারা গাজার ওপর থেকে ইসরায়েলি নৌ অবরোধ ভাঙার এই লড়াই চালিয়ে যাবেন। সাগরে ফেলে আসা বাকি নৌকাগুলোতে অবস্থানরত কর্মীদের জীবন বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
