রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর তাণ্ডব: প্রাণ হারাল শিশুসহ একই পরিবারের ৪ সদস্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর তাণ্ডব: প্রাণ হারাল শিশুসহ একই পরিবারের ৪ সদস্য

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। বৃহস্পতিবারের এই হামলায় অন্তত ১৪ জন লেবানিজ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ)। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় চালানো এই বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বহু বেসামরিক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ইসরায়েল ক্রমাগত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি হয়েছে জেবচিত পৌর এলাকায়। সেখানে একটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলায় তিন জন নিহত এবং অন্তত সাত জন আহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই জনাকীর্ণ ভবনটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে তৌল নামক আরেকটি পৌরসভায় পৃথক হামলায় একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এসব ঘটনায় ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তৌল এলাকায় পরবর্তী আরও একটি হামলায় আরও এক জন প্রাণ হারান এবং দুই জন গুরুতর আহত হন।

ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন কেবল জেবচিত বা তৌল এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হারুফ পৌরসভায় চালানো হামলায় দুই জন নিহত হয়েছেন এবং একটি বসতবাড়ি পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননের জাওতার আল-শারকিয়াহ, ইয়োহমোর আল-শাকিফ এবং বায়ত আল-সাইয়াদ শহরে ব্যাপক আর্টিলারি শেলিং বা কামানের গোলা বর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসরায়েলি বিমান হামলায় মোট ২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই জন লেবানিজ সেনা সদস্য এবং তিন জন প্যারামেডিক বা চিকিৎসা সেবাকর্মীও রয়েছেন।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনাকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে উদ্ধারকর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যা জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গত ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ জন, যাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান থামানোর কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ লেবাননের বিঁত জবেইলসহ বিভিন্ন শহরে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে তা এখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননকে কার্যত একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি দমনের দোহাই দিলেও অধিকাংশ হামলাই চালানো হচ্ছে বেসামরিক বসতবাড়িতে। বিশেষ করে চিকিৎসা কর্মীদের ওপর হামলা চালানোর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় জরুরি সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েলের এই ক্রমবর্ধমান হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পূর্ণাঙ্গ ধস নামাতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।

লেবাননের সাধারণ মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। বৈরুতের উপকণ্ঠ থেকে শুরু করে দক্ষিণের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত সর্বত্রই ইসরায়েলি ড্রোনের আনাগোনা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, নির্বিচারে আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ছে। শীতের এই সময়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয়হীন মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ইসরায়েলি পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া না হলেও তারা দাবি করে আসছে যে, তাদের লক্ষ্যবস্তু কেবল সামরিক অবকাঠামো। তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আবাসিক ভবন এবং নিহত শিশুদের মৃতদেহ সেই দাবির সত্যতাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

banner
Link copied!