রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ইসরায়েলি পুলিশের বৈষম্য ও ফিলিস্তিনি জনপদে অপরাধের বিস্তার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২, ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম

ইসরায়েলি পুলিশের বৈষম্য ও ফিলিস্তিনি জনপদে অপরাধের বিস্তার

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির যখন সম্প্রতি ক্যামেরাগুলোর সামনে এসে তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগের ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল কঠোর আত্মবিশ্বাস। গত সপ্তাহে ২১ বছর বয়সী সাবেক ইসরায়েলি সেনা ইয়ামানু বিনিয়ামিন জালকার হত্যাকাণ্ডের পর বেন-গিভির স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে এটি হবে অপরাধের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে রাস্তায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হবে এবং অপরাধীদের পুলিশি শক্তির কঠোর মুখোমুখি হতে হবে। তবে এই প্রতিশ্রুতির আড়ালে যে বাস্তব চিত্রটি লুকানো আছে তা হলো ইসরায়েলি পুলিশের একটি দ্বিমুখী নীতি। বিশেষ করে ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জনপদগুলোতে যখন অপরাধের মহামারি চলছে, তখন এই একই মন্ত্রীর কণ্ঠে কিংবা পুলিশের তৎপরতায় সেই সংকল্প খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি জনপদে এখন যে মাত্রায় সহিংসতা ও হত্যার হার বেড়েছে তা নজিরবিহীন। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সহিংসতার শিকার হয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলের নিজস্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে যে এই অপরাধের কারণে দেশটির বছরে প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে পুলিশের অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাকে। মানবাধিকার কর্মী এবং ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদরা দীর্ঘকাল ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ইসরায়েলি পুলিশ কেবল ইহুদি নাগরিকদের নিরাপত্তার দিকেই মনোযোগী। অন্যদিকে তথাকথিত আরব সেক্টরে অপরাধীরা যখন একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তখন পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

পরিসংখ্যানগতভাবে বিচার করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ইসরায়েলি সংবাদপত্র হ্যারেৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে হত্যার হার ২০২০ সালে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ছিল ৪.৯ জন। কিন্তু বর্তমানে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লাখে ১১ জনে। এই ভয়াবহ চিত্রটি ইরাক বা সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর অপরাধের হারের সঙ্গে তুলনীয়। অথচ এর বিপরীতে ইসরায়েলের ইহুদি সমাজে হত্যার হার প্রতি লাখে মাত্র ০.৬ জন। এই বিশাল ব্যবধানটিই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের ভেতরের এক বিশাল অংশকে কার্যত নিরাপত্তার বাইরে রাখা হয়েছে। আর এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী সরকার।

বিশ্লেষকদের মতে বেন-গিভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্টরপন্থীদের ক্ষমতায় আসা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা মনে করেন এই সরকারের নীতিগুলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষপূর্ণ। হাদাাশ পার্টির সদস্য এবং ফিলিস্তিনি আইনপ্রণেতা আয়দা তৌমা-সুলেমান দীর্ঘ দিন ধরেই আরব জনপদে পুলিশি গাফিলতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি মনে করেন যে সরকার সম্ভবত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ দেখে স্বস্তি বোধ করছে। তার মতে যখন ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মধ্যে খুনাখুনিতে লিপ্ত থাকে, তখন ইসরায়েলি পুলিশ একে কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে না দেখে একটি শত্রু পক্ষীয় বিষয় হিসেবে দেখে। যেখানে ইহুদি এলাকাগুলোতে প্রচুর পুলিশ স্টেশন রয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিনি জনপদে পুলিশি উপস্থিতি নামমাত্র।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো মোকাবেলা করার পরিবর্তে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি সরকার ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের জন্য পরিকল্পিত একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রায় ৬৮.৫ মিলিয়ন ডলার কর্তন করার অনুমোদন দিয়েছে। বলা হচ্ছে এই টাকা পুলিশি কার্যক্রম জোরদারে ব্যয় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো অপরাধ দমনের নামে যে উন্নয়ন বরাদ্দ কাটছাঁট করা হচ্ছে, তাতে ওই এলাকার আবাসন ও অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হবে। ফিলিস্তিনি নাগরিকরা যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ, তারা ঐতিহাসিকভাবেই বৈষম্যের শিকার। ১৯৪৮ সালের নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের পর থেকে যারা এই ভূমিতে রয়ে গেছেন, তাদের উত্তরসূরিরাই এখন ইসরায়েলি নাগরিক। কিন্তু তারা ক্রমাগত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বাস করছেন।

অর্থনৈতিক এই দুরাবস্থা অপরাধ চক্র গড়ে ওঠার প্রধান কারণ। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকে পশ্চিম তীরে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব চরমে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের সরকারি তথ্যমতে প্রায় ৩৭.৬ শতাংশ ফিলিস্তিনি পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এই চরম দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের অপরাধী গ্যাং বা মাফিয়া ঘরানার সংগঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তাল মনে করেন সরকার এই অপরাধ চক্রগুলোকে আড়াল থেকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তার মতে এই গ্যাংগুলো অনেক সময় রাষ্ট্রের জন্য তথ্য সরবরাহকারী হিসেবেও কাজ করে। ফলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে হাত গুটিয়ে থাকে।

বেন-গিভিরের ভূমিকা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। তিনি কেবল পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন না, বরং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ মূলধারার আলোচনায় উঠে এসেছে। এমনকি হাই কোর্টকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে তার এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্যকার দ্বন্দ্বে। ইসরায়েলের লিবারেল পত্রিকাগুলো এখন সরাসরি অভিযোগ করছে যে যখন দেশে হত্যার হারের রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে, তখন জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী কেবল টিকটক বা প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন। এই উদাসীনতা কেবল এক পক্ষীয় নয় বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অবহেলার অংশ যা ফিলিস্তিনি জনপদগুলোকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অবশেষে এই অপরাধের মহামারি কেবল একটি সম্প্রদায়ের সংকট নয় বরং এটি ইসরায়েলি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই দুই স্তরের বা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বহাল থাকবে, ততক্ষণ রক্তক্ষরণ কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফিলিস্তিনি নাগরিকরা এখন দাবি করছেন যে তাদের জন্য আলাদা কোনো অনুকম্পা নয় বরং কেবল সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবমুখী তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে জাতিগত বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক এজেন্ডা সাধারণ মানুষের জানমালের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

banner
Link copied!