গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের ফলে ফিলিস্তিনি শিশুরা এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক সংঘাত এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র হামলায় কয়েক হাজার শিশু প্রাণ হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার প্রতিটি শিশু এখন কোনো না কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির শিকার।
যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব ছাড়াও বর্তমানে তীব্র খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসার অভাব এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে গাজায় শিশুদের একটি বড় অংশ এখন "ডব্লিউসিএনএসএফ" বা এমন শিশু যাদের পরিবারের কেউ বেঁচে নেই এবং তারা নিজেরাও গুরুতর আহত। এই শিশুদের পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে বাবা-মা বা স্বজনদের হারিয়ে দিশেহারা এই শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে যে গাজার অনেক অঞ্চলে শিশুরা শুধুমাত্র এক বেলা খাবারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে, তবুও পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না।
উত্তর গাজার পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন যেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সেখানে দুর্ভিক্ষের ছায়া স্পষ্ট এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মৃত্যুর হার বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গাজার হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আহত শিশুদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অ্যানেস্থেশিয়া বা পর্যাপ্ত ওষুধ ছাড়াই অনেক শিশুর চিকিৎসা করতে হচ্ছে যা অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেক কিশোর ও শিশু।
শিক্ষার অধিকার থেকেও সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। গত দুই বছরে গাজার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয় ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একটি পুরো প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে এটি একটি সুপরিকল্পিত "স্কলাসটিসাইড" বা শিক্ষা ধ্বংসের প্রক্রিয়া। শিশুদের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ শুধু ফিলিস্তিন নয় বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের প্রতি সদয় হওয়া একটি মৌলিক শিক্ষা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এতিম ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর প্রেক্ষাপটে বলা যায়: "তারা আপনাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।
বলুন, তাদের সংশোধন করে দেওয়া উত্তম।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২২০)। গাজার এই নিষ্পাপ শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কোনো একক জাতির দায়িত্ব নয় বরং এটি বৈশ্বিক নৈতিকতার পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।
গাজার শিশুদের এই আহাজারি কেবল একটি অঞ্চলের সংবাদ নয় বরং এটি বিশ্ব বিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্ন। প্রতিদিনের রকেট হামলা এবং গোলার শব্দের মাঝে বেড়ে ওঠা এই শিশুদের শৈশব চুরি হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলো গাজায় শিশুদের ওপর হওয়া এই সহিংসতাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করার দাবি জানাচ্ছে। তবে কূটনৈতিক জটিলতায় ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। গাজার প্রতিটি প্রান্তে এখন কেবল বেঁচে থাকার আকুতি আর শান্তির প্রতীক্ষা।
