রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

জুন যুদ্ধের ৫১ বছর: আল-আকসা ও পশ্চিম তীর দখলের সেই কালো অধ্যায়ের ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

জুন যুদ্ধের ৫১ বছর: আল-আকসা ও পশ্চিম তীর দখলের সেই কালো অধ্যায়ের ইতিহাস

ফিলিস্তিনিদের জাতীয় ইতিহাসে ‍‍`নাকসা‍‍` বা ‍‍`বিপর্যয়‍‍` একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়। ১৯৪৮ সালের ‍‍`নকবা‍‍` বা মহাবিপর্যয়ের মাত্র ১৯ বছর পর, ১৯৬৭ সালের জুন মাসে ইসরায়েল মাত্র ছয় দিনের যুদ্ধে তৎকালীন আরবের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বাকি অংশ দখল করে নেয়। আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে এই যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আজ ৫১ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দখলের ক্ষত এখনও ফিলিস্তিনিদের জীবনে রক্ত ঝরাচ্ছে।

১৯৬৭ সালের ৫ জুন সকালে ইসরায়েল মিশরের বিমানঘাঁটিগুলোতে অতর্কিত বিমান হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা করে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মিশরের বিমান বাহিনীর ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে আরবের স্থলবাহিনী আকাশপথের সুরক্ষা হারিয়ে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারায়। আল জাজিরার তথ্যমতে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের মূলে ছিল ১৯৪৮ সালের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। তৎকালীন ইসরায়েলি মন্ত্রী ইগাল আলন লিখেছিলেন যে, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে যে ঐতিহাসিক ভুল করা হয়েছিল, নতুন যুদ্ধে তা সংশোধন করে ‍‍`সম্পূর্ণ বিজয়‍‍` এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ড পূর্ণ করতে হবে। এই ‍‍`territorial fulfillment‍‍` এর লক্ষ্যেই ইসরায়েল ফিলিস্তিনের প্রতিটি প্রান্তে তার থাবা বিস্তার করে।

যুদ্ধের ফলে ৩ লক্ষ ফিলিস্তিনি নতুন করে গৃহহীন হন, যাদের মধ্যে ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ ১৯৪৮ সালের যুদ্ধেও একবার উদ্বাস্তু হয়েছিলেন। জর্ডান নদীর আব্দুল্লাহ ও হোসেন ব্রিজ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আজও সেই বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে আছে। ইসরায়েলি বাহিনী কেবল ভূমি দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে ইমওয়াস, বেইত নুবা এবং ইয়ালু গ্রামগুলোকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়। তৎকালীন সামরিক কমান্ডার মোশে দয়ান এবং আইজাক রবিনের নেতৃত্বে এই জাতিগত নিধন চালানো হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে প্রমাণিত।

জেরুজালেমের ওল্ড সিটি বা পুরাতন শহর দখল ছিল ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও ধর্মীয় বিজয়। ৭ জুন ইসরায়েলি প্যারাট্রুপাররা ওল্ড সিটি দখল করার পর সেখানকার ৭৭০ বছরের পুরনো মরোক্কান কোয়ার্টার বা মাগরেবি পাড়াটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০০টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে কয়েক ঘণ্টার নোটিশে উচ্ছেদ করে ওই এলাকাটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম দেয়াল বা আল-বুরাক দেয়ালের সামনে ‍‍`ওয়েস্টার্ন ওয়াল প্লাজা‍‍` তৈরি করা। আজ যেখানে ইহুদিরা প্রার্থনা করেন, তার নিচে চাপা পড়ে আছে শত বছরের পুরনো ফিলিস্তিনি ইতিহাস ও মানুষের ঘরবাড়ি।

১৯৬৭ সালের এই পরাজয় ফিলিস্তিনিদের মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এক বিশাল আঘাত হানে। আরব সরকারগুলোর ওপর থেকে তাদের আস্থা উঠে যায় এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা তারা গভীরভাবে অনুভব করে। তবে ইসরায়েলিদের জন্য এটি ছিল এক অলৌকিক বিজয়ের মতো। এই বিজয়ের পর থেকেই ইসরায়েলে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পুরো ‍‍`পবিত্র ভূমি‍‍` দখল করা তাদের ঈশ্বরদত্ত অধিকার। এর ফলে শুরু হয় অবৈধ বসতি স্থাপনের রাজনীতি, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও ইসরায়েল তা আজও অব্যাহত রেখেছে।

বর্তমানে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজায় প্রায় ৫১ লক্ষ মানুষ ইসরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে বাস করছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, এই দখলদারিত্বের চরিত্র হলো পদ্ধতিগত বৈষম্য, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। ফিলিস্তিনিদের জন্য চেকপোস্ট, পারমিট সিস্টেম এবং পৃথকীকরণ দেয়ালের মাধ্যমে একটি ‍‍`অ্যাপার্টহাইড‍‍` বা বর্ণবাদী ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। অন্যদিকে, দখলকৃত জমিতে ৬ লক্ষাধিক ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য বিলাসবহুল বসতি তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিম তীরের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি এখন বসতি স্থাপনকারী ও তাদের অবকাঠামোর দখলে।

নাকসা বা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের প্রভাব কেবল ফিলিস্তিনিদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনির নুসাইবা আল জাজিরাকে বলেন, এই দখলদারিত্ব বিশ্বকে ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার এই দখলদারিত্ব অবসানের কথা বললেও ইসরায়েল তার সাম্রাজ্যবাদী নীতি থেকে সরে আসেনি। নাকসা তাই ফিলিস্তিনিদের কাছে কেবল একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি একটি চলমান ট্র্যাজেডি—যা আজও তাদের নিজ ভূমিতে পরবাসী করে রেখেছে।

banner
Link copied!