রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

মসজিদুল আকসা: ইসলামের প্রথম কিবলা ও পবিত্র মেরাজের পুণ্যভূমি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম

মসজিদুল আকসা: ইসলামের প্রথম কিবলা ও পবিত্র মেরাজের পুণ্যভূমি

মসজিদুল আকসা, যা বায়তুল মুকাদ্দাস নামেও পরিচিত, বিশ্বের কয়েক কোটি মুসলিমের কাছে ঈমানি চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেরুজালেমের পুরাতন শহরে অবস্থিত এই পবিত্র স্থানটি মক্কা ও মদিনার পর ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা এই মসজিদের চারপাশকে বরকতময় বলে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "পরম পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিবেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চতুর্পার্শ্বকে আমি বরকতময় করেছি..." (সূরা আল-ইসরা, ১৭:১)। এই আয়াতের মাধ্যমেই কিয়ামত পর্যন্ত এই ভূমির পবিত্রতা ও গুরুত্ব নির্ধারিত হয়ে গেছে।

ইতিহাসের পাতায় মসজিদুল আকসা একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি ছিল ইসলামের প্রথম কিবলা। মক্কায় অবস্থানকালে এবং মদিনায় হিজরতের পরবর্তী প্রায় ১৭ মাস মহানবী (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম মসজিদুল আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে কিবলা পরিবর্তিত হয়ে কাবা শরিফের দিকে নির্ধারিত হয়। এছাড়া, ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম অলৌকিক ঘটনা ‍‍`ইসরা ও মেরাজ‍‍`-এর প্রধান কেন্দ্র ছিল এই মসজিদ। মহানবী (সা.) মক্কা থেকে এখানে আসেন এবং এখান থেকেই সপ্ত আসমান পাড়ি দিয়ে আল্লাহর দিদার লাভ করেন। এই পবিত্র ভূমিতেই তিনি পূর্ববর্তী সকল নবীদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেছিলেন।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদুল আকসা কমপ্লেক্স বা ‍‍`হারাম আল-শরিফ‍‍` প্রায় ১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। অনেকেই ভুলবশত সোনালী গম্বুজ বিশিষ্ট ‍‍`ডোম অফ দ্য রক‍‍` বা কুব্বাতুস সাখরাকে মূল মসজিদ মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে, এই পুরো চত্বরটিই পবিত্র এবং এর দক্ষিণ অংশে রুপালি গম্বুজ বিশিষ্ট ‍‍`কিবলি মসজিদ‍‍` অবস্থিত, যেখানে নামাজ আদায় করা হয়। বর্তমানের এই বিশাল অবকাঠামো মূলত উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান এবং তার ছেলে আল-ওয়ালিদের আমলে (৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে) নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আব্বাসীয়, ফাতেমীয় এবং অটোমান শাসকরা এর সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন করেছেন।

বর্তমানে মসজিদুল আকসা কেবল একটি ইবাদতখানা নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ও প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে এই পবিত্র স্থানটি ইসরায়েলি দখলের কবলে রয়েছে। আল জাজিরার তথ্যমতে, প্রতিনিয়ত ইসরায়েলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এই মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন করছে। বিশেষ করে রমজান মাসে এবং জুমার নামাজের সময় ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং হামলার ঘটনা বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় তোলে। তবে শত বাধা সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর কাছে এই মসজিদের মর্যাদা এক চুলও কমেনি।

ইউনেস্কো ১৯৮১ সালে এই ঐতিহাসিক এলাকাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জেরুজালেম এবং এর ধর্মীয় স্থানগুলোর একটি বিশেষ মর্যাদা থাকলেও বর্তমানে তা রাজনৈতিক সংকটের আবর্তে পড়েছে। তা সত্ত্বেও, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমরা এই পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কারণ মহানবী (সা.) বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে সওয়াবের নিয়তে সফর করা বৈধ নয়—মসজিদুল হারাম, মসজিদুল নববী এবং মসজিদুল আকসা (সহীহ আল-বুখারী, ১১৮৯)। এই হাদিসটিই প্রমাণ করে যে মুসলিমদের হৃদয়ে আল-আকসা মসজিদ কতটা গভীর ও পবিত্র স্থান জুড়ে আছে।

banner
Link copied!