ইসলামের সুদীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসে যে কয়েকটি স্থান মুসলমানদের ইমান ও অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো পবিত্র মসজিদুল আকসা। জেরুজালেমের ওল্ড সিটির `হারাম আশ-শরিফ` প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই মসজিদটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি নবীদের পদচারণায় ধন্য এক বরকতময় ভূখণ্ড। মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর এটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। আল জাজিরা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথির তথ্যমতে, এই পুরো ১৪৪,০০০ বর্গমিটার এলাকাটিই অত্যন্ত পবিত্র, যার প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে ইসলামের আদি ইতিহাস।
আল-আকসা মসজিদের ধর্মীয় গুরুত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এটি মুসলমানদের `প্রথম কিবলা`। নবুয়তের পর মক্কায় থাকাকালীন এবং মদিনায় হিজরতের পর প্রায় ১৬ থেকে ১৭ মাস পর্যন্ত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম এই বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করতেন। এটি ছিল আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ দিকনির্দেশনা, যা পরবর্তীতে সূরা আল-বাকারার মাধ্যমে কাবার দিকে পরিবর্তিত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আমি আপনাকে বারবার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, আমি অবশ্যই আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা আপনি পছন্দ করেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৪৪)। কিবলা পরিবর্তনের এই ঘটনা আল-আকসার প্রতি মুসলমানদের এক গভীর আত্মিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন তৈরি করে দিয়েছে।
এই পবিত্র ভূমির সাথে জড়িয়ে আছে নবী করিম (সা.)-এর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর এবং অলৌকিক ঘটনা—মিরাজ বা ঊর্ধ্বগমন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরা-তে এই সফরের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, "পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে সফর করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশকে আমি বরকতময় করেছি।" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:১)। মিরাজের সেই রাতে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে বোরাকে চড়ে মহানবী (সা.) এখানে তশরিফ আনেন। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসূলদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এরপর এখান থেকেই তিনি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান। এই কারণেই প্রতি বছর শবে মিরাজের সময় সারা বিশ্বের মুসলিমদের মনে আল-আকসার স্মৃতি নতুন করে সজীব হয়ে ওঠে।
মসজিদুল আকসা কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং এটি মহান আল্লাহ কর্তৃক ঘোষিত এক বরকতময় ভূমি। হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদুল আকসা পৃথিবীর দ্বিতীয় মসজিদ যা কাবার ৪০ বছর পর নির্মিত হয়েছিল। (সহীহ আল-বুখারী, ৩৩৬৬)। ইসলামের সোনালী যুগে খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর হাত ধরে এই শহর বিজিত হওয়ার পর তিনি নিজেই এই প্রাঙ্গণটি পরিষ্কার করেন এবং মুসলমানদের জন্য ইবাদতের উপযুক্ত করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া থেকে শুরু করে উসমানীয় যুগ পর্যন্ত মুসলিম শাসকরা এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্য বর্ধনে কাজ করেছেন। এখানকার রূপালী গম্বুজ বিশিষ্ট `আল-কিবলি মসজিদ` এবং সোনালী গম্বুজ বিশিষ্ট `ডোম অফ দ্য রক` স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
আধুনিক যুগে এই পবিত্র ভূমিটি এক চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৪ মে-র পর থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের ফলে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ইবাদতের অধিকার বারবার খর্ব করা হচ্ছে। তবুও ফিলিস্তিনিদের কাছে আল-আকসা তাদের ইমান ও আত্মপরিচয়ের শেষ ঠিকানা। তারা বিশ্বাস করে, এই পুণ্যভূমি কেবল ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং এটি পুরো মুসলিম বিশ্বের আমানত। আল জাজিরার প্রতিবেদনে দেখা যায়, শত বছরের জুলুম আর নির্যাতনের মুখেও এখানকার মুসল্লিরা আল-আকসার মিনার থেকে আজানের ধ্বনি বন্ধ হতে দেননি।
পরিশেষে বলা যায়, মসজিদুল আকসা আমাদের প্রথম কিবলা, আমাদের নবীদের আবাসভূমি এবং মিরাজের প্রবেশদ্বার। এই মসজিদের প্রতি ভালোবাসা রাখা প্রতিটি মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। এটি কেবল একটি পাথরের ইমারত নয়, এটি হকের ওপর টিকে থাকার এক চিরন্তন প্রতীক। কিয়ামত পর্যন্ত এই ভূমি মুমিনদের জন্য বরকত ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
