পবিত্র জেরুজালেম শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হারাম আশ-শরিফ বা আল-আকসা প্রাঙ্গণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। তবে এই পবিত্র প্রাঙ্গণের স্থাপনাগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি সূক্ষ্ম বিভ্রান্তি বিদ্যমান। অনেকেই উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজ বা `ডোম অফ দ্য রক`-কে প্রধান আল-আকসা মসজিদ হিসেবে মনে করেন। কিন্তু ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সত্য হলো, আল-আকসা কেবল একটি একক ভবন নয়, বরং পুরো ১৪৪,০০০ বর্গমিটারের প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণটিই হলো `মসজিদুল আকসা`। এই প্রাঙ্গণের ভেতরেই রয়েছে ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্মিত দুটি প্রধান ও অনন্য স্থাপত্য—কুব্বাতুস সাখরা ও আল-কিবলি মসজিদ।
কুব্বাতুস সাখরা বা `ডোম অফ দ্য রক` হলো আল-আকসা প্রাঙ্গণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং পরিচিত স্থাপনা। এটি মূলত একটি অষ্টভুজাকৃতির মার্বেল পাথর ও মোজাইক দিয়ে তৈরি কাঠামো, যার মাথায় রয়েছে উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজ। উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশে ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মিত হয়। এই স্থাপনার ঠিক মাঝখানে একটি বড় পাথর বা `সাখরা` রয়েছে, যা থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, মিরাজের রাতে এখান থেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন। কুব্বাতুস সাখরার স্থাপত্যশৈলী উমাইয়া আমলের কারুকার্য ও বাইজেন্টাইন নকশার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা গত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে স্থপতি ও পর্যটকদের মুগ্ধ করে আসছে।
অন্যদিকে, প্রাঙ্গণের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত রূপালী বা কালচে গম্বুজ বিশিষ্ট দীর্ঘ ভবনটি হলো `জামে আল-আকসা` বা আল-কিবলি মসজিদ। এটিই সেই মূল স্থান যেখানে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা হয়। খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের সময় এর নির্মাণ কাজ শুরু হলেও তাঁর পুত্র খলিফা আল-ওয়ালিদ ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে এটি সম্পন্ন করেন। তবে সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটি আব্বাসীয় এবং ফাতেমীয় যুগে কয়েকবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। আল-কিবলি মসজিদের ভেতরে রয়েছে ২৮০টি বিশালাকার স্তম্ভ এবং চমৎকার সব খিলান। এর মেহরাব ও কাঠের কাজগুলো মধ্যযুগীয় ইসলামি শিল্পের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
স্থাপত্যগতভাবে এই দুটি ভবনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কুব্বাতুস সাখরা যেখানে মিরাজের স্মারক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা মাজার সদৃশ কাঠামো, সেখানে আল-কিবলি মসজিদটি একটি পূর্ণাঙ্গ জামে মসজিদ হিসেবে নকশা করা হয়েছে। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পুরো প্রাঙ্গণটিই সমভাবে পবিত্র। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মিরাজের রাতে এখানে ইমামতি করেছিলেন, তখন পুরো প্রাঙ্গণটিই ছিল একটি বিশাল মাঠের মতো। পরবর্তীতে খলিফাদের আমলে নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো গড়ে ওঠে। ব্রিটানিকা ও আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাঙ্গণে আরও অনেক ছোট ছোট গম্বুজ, পানির ফোয়ারা এবং মাদ্রাসা রয়েছে, যা একে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কমপ্লেক্সে পরিণত করেছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন স্যুভেনিয়ারে সোনালী গম্বুজকেই বারবার আল-আকসা হিসেবে তুলে ধরায় সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেক সময় দখলদার শক্তির পক্ষ থেকেও এই বিভ্রান্তিকে উসকে দেওয়া হয় যাতে মূল জামে আল-আকসার দিকে মানুষের মনোযোগ কম থাকে। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এই দুই স্থাপত্যের পার্থক্য এবং এদের সম্মিলিত ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আল-আকসা প্রাঙ্গণের এই সোনালী ও রূপালী গম্বুজের মেলবন্ধন কেবল স্থাপত্যের বিস্ময় নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য মিনার।
