পবিত্র মসজিদুল আকসার ইতিহাস কেবল ইট-পাথরের কোনো ইমারত নয়, বরং এটি ইসলামি সভ্যতার উত্থান, পতন এবং বীরত্বগাথার এক জীবন্ত মহাকাব্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পবিত্র ভূমিটি বারবার বিভিন্ন শক্তির শাসনে এসেছে, তবে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিজয় ছিল এই অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁদের দুজনের মাধ্যমেই আল-আকসা কেবল মুক্তিই পায়নি, বরং লাভ করেছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা।
আল-আকসার প্রথম মুসলিম বিজয় ঘটে ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর নেতৃত্বে যখন ইসলামি বাহিনী জেরুজালেমের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন শহরটির তৎকালীন খ্রিষ্টান প্রধান সফ্রোনিয়াস একটি শর্ত দেন। তিনি বলেন, খলিফা নিজে উপস্থিত হলে তবেই তিনি শহরের চাবি হস্তান্তর করবেন। উমর (রা.) তাঁর ভৃত্যের সাথে উট পরিবর্তন করে অত্যন্ত সাধারণভাবে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, যা ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আল জাজিরার ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, উমর (রা.)-এর এই বিজয় ছিল সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন। তিনি অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক `উমরি চুক্তি` স্বাক্ষর করেন। জেরুজালেমে প্রবেশের পর তিনি দীর্ঘ অবহেলার শিকার আল-আকসা প্রাঙ্গণটি খুঁজে বের করেন। তৎকালীন রোমানরা এই পবিত্র স্থানটিকে আস্তাকুড়ে পরিণত করেছিল। আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.) নিজের জামার আচল দিয়ে সেই পবিত্র ময়লা পরিষ্কার শুরু করলে সাহাবায়ে কেরামও তাঁর সাথে যোগ দেন। তাঁর এই বিনয় ও মমত্ববোধই আল-আকসাকে প্রথম মুসলিম স্থাপত্যের রূপ দিয়েছিল।
উমর (রা.)-এর বিজয়ের প্রায় ৫০০ বছর পর ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধে ইউরোপীয় বাহিনী জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেই সময় আল-আকসা প্রাঙ্গণে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল এবং পবিত্র মসজিদটিকে আস্তাবল ও প্রাসাদে রূপান্তর করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৮৮ বছরের সেই অন্ধকার শাসনের অবসান ঘটে ১১৮৭ সালে বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর হাত ধরে। হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে তিনি যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, তখন তিনি উমর (রা.)-এর সেই মহানুভবতার পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি পরাজিত শত্রুদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেননি, বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিজয়ের পর আল-আকসা মসজিদকে পুনরায় ইবাদতের উপযোগী করতে এক অভাবনীয় কাজ করা হয়। সুলতানের নির্দেশে সিরিয়া থেকে কয়েক মণ খাটি গোলাপজল নিয়ে আসা হয় এবং পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ সেই সুগন্ধি পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করা হয়। সালাহউদ্দিনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তাঁর পূর্বসূরি নুরুদ্দিন জানগির একটি আজীবন ইচ্ছা পূরণ করা। নুরুদ্দিন জানগি আল-আকসার জন্য একটি অত্যন্ত চমৎকার ও শিল্পমণ্ডিত কাঠের মেহরাব বা মিম্বর তৈরি করিয়েছিলেন, যা `নুরুদ্দিন মেহরাব` নামে পরিচিত। সালাহউদ্দিন সেই ঐতিহাসিক মিম্বরটি সিরিয়া থেকে আনিয়ে আল-আকসায় স্থাপন করেন। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, এই বিজয়টি ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্য এক মহা-জাগরণ, যা ইসলামি স্বর্ণযুগের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উমর (রা.) এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবী—এই দুই মহানায়কের বীরত্ব ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে আল-আকসা আজও দাঁড়িয়ে আছে। উমর (রা.) শিখিয়েছেন কীভাবে বিজয়ী হয়েও বিনয়ী হতে হয় এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হয়। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন শিখিয়েছেন কীভাবে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ক্ষমা ও মহানুভবতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। তাঁদের দুজনের শাসনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইনসাফ বা ন্যায়বিচার। আজ যখন আল-আকসা আবারও দখলদারিত্বের কবলে, তখন মুসলিম উম্মাহর জন্য এই দুই বীরের ইতিহাস কেবল পাঠ্যপুস্তকের গল্প নয়, বরং এটি ফিরে আসার এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। আল-আকসার প্রতিটি পাথর আজও উমর (রা.)-এর স্পর্শ এবং সালাহউদ্দিনের গোলাপজলের ঘ্রাণ বহন করে চলছে।
