পবিত্র মসজিদুল আকসা কেবল একটি ইমারত নয়, এটি ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের অস্তিত্বের শেকড় এবং জাতীয় মুক্তির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তবে গত কয়েক দশক ধরে এই পবিত্র ভূমি এক চরম আধুনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের (নাকসা) পর থেকেই আল-আকসা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ৫৯ বছরে এই প্রাঙ্গণটি বারবার রক্তাক্ত হয়েছে, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অবিচল ইমান ও সাহসিকতার কাছে পিছু হটেছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র।
বর্তমানে আল-আকসা প্রাঙ্গণের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। আল জাজিরা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের প্রবেশাধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিশেষ করে জুমার নামাজ এবং পবিত্র রমজান মাসে তরুণ ফিলিস্তিনিদের এই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ৫০ বছরের কম বয়সী পুরুষদের জন্য গেটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা সশস্ত্র পাহারায় প্রায়শই মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালায়, যা সেখানকার শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে তোলে।
এতসব বাধা, টিয়ার গ্যাস আর সাউন্ড গ্রেনেডের মুখেও ফিলিস্তিনিদের পিছু হঠানো যায়নি। প্রতিদিন ফজরের আজানের সময় যখন জেরুজালেমের অলিগলি অন্ধকার থাকে, তখন থেকেই বৃদ্ধ ও তরুণরা আল-আকসার দিকে যাত্রা শুরু করেন। ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে, কখনও কখনও গায়ে হাত তোলার মতো অপমান সহ্য করেও তারা মসজিদে হাজিরা দেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং এটি তাদের ভূখণ্ড ও প্রথম কিবলার মালিকানা রক্ষার একটি নিরব প্রতিবাদ। আল-আকসা তাদের কাছে ইমানের এক এমন দুর্গ, যা কোনো সামরিক শক্তি দিয়ে জয় করা সম্ভব নয়।
ফিলিস্তিনি নারীদের ভূমিকাও এই সংগ্রামে অনন্য। `মুরাবিতাত` বা আল-আকসার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পরিচিত এই নারীরা দিনের পর দিন মসজিদের প্রাঙ্গণে কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে অবস্থান করেন। ইসরায়েলি পুলিশ যখন তাদের বলপ্রয়োগ করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন তাদের `আল্লাহু আকবার` ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় জেরুজালেমের আকাশ। এই মায়েরা এবং বোনেরা বিশ্বাস করেন যে, আল-আকসার পবিত্রতা রক্ষা করা তাদের ইমানি দায়িত্ব। তাদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
আধুনিক এই সংকটে আল-আকসার প্রাঙ্গণে ড্রোন নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে মুসল্লিদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। প্রায়শই মসজিদের ভেতরে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে প্রাচীন এই স্থাপনার কার্পেট ও মেহরাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা তাদের শিশুদের আল-আকসার প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম শৈশব থেকেই এই মাটির পবিত্রতা এবং এর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে। তারা পাথরের ওপর বসে সাহরি করেন, ইফতার করেন এবং হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনের আনন্দ খুঁজে নেন।
পরিশেষে, আল-আকসার বর্তমান সংকট কেবল ফিলিস্তিনিদের একার নয়, এটি পুরো বিশ্বের বিবেকবান মানুষের। তবে ফিলিস্তিনিদের যে অবিচল ইমান আমরা দেখি, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তারা প্রমাণ করেছেন যে, ইমানের শক্তি যখন পাহাড়ের মতো অটল হয়, তখন কোনো দেয়াল বা বন্দুক তাকে অবরুদ্ধ করতে পারে না। আল-আকসা আজও দাঁড়িয়ে আছে সেই সব বিশ্বাসী মানুষের আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করে, যারা প্রতিদিন নিজেদের জীবন বাজি রেখে প্রথম কিবলার মর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন।
