রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

লেবানন সংকট ও ইরান-মার্কিন চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২১, ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম

লেবানন সংকট ও ইরান-মার্কিন চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত বুধবার একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় নতুন শান্তি চুক্তিটি গভীর সংকটের মুখে পড়েছে বলে রবিবার বৈরুত থেকে আল জাজিরা জানিয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে চুক্তির পর দিনগুলোতেও ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলা বন্ধ হয়নি বরং তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই ধারাবাহিক হামলার কারণে গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৪,০০০ ছাড়িয়ে গেছে যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। ইসরায়েলের এই আগ্রাসী ভূমিকার প্রতিবাদে ইরান গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পূর্বনির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। এই স্থগিতাদেশের ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা গোপন আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত প্রগতি এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করা। চুক্তির নথিতে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছিল যে চূড়ান্ত চুক্তিটি লেবাননসহ সবকটি ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করবে এবং কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু মাঠपर্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে। ইসরায়েল এই চুক্তির শর্তগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করছে অথবা তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করার জন্য একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আমেরিকার মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকেও বিশ্বের দরবারে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে কারণ তারা তেহরানকে আশ্বস্ত করেছিল যে চুক্তির পর সব ধরনের উস্কানিমূলক সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা হবে।

লেবাননের অভ্যন্তরে এই সংকট নিরসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং লেবানন সরকার উভয়ই লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং তাদের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তবে এই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের কৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর আদর্শিক ও কৌশলগত ফারাক বিদ্যমান রয়েছে। হিজবুল্লাহ জোরালোভাবে মনে করে যে লেবাননের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়টি সরাসরি ইরানের সাথে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনার সাথে যুক্ত করা উচিত। তাদের মতে তেহরানের পক্ষ থেকে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি না করলে ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এর বিপরীতে বৈরুতের কেন্দ্রীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বা regional

শক্তির ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ইসরায়েলের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধের সমাধান করতে বেশি আগ্রহী।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের লেবানন বিষয়ক প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ মাইকেল ইয়াং এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন যে এই দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তির সাফল্যের জন্য লেবানন একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ও প্রাথমিক শর্ত হিসেবে কাজ করছে। ইরানি নীতিনির্ধারকরা বারবার এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এই সমঝোতা স্মারকের পূর্ণ কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য। তেহরান তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা এবং political

ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না করে আমেরিকার সাথে কোনো চূড়ান্ত বা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে না। ফলে লেবাননের মাটিতে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান না ঘটলে পুরো ইরান-মার্কিন চুক্তিটি মাঝপথেই সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যা এই অঞ্চলের জন্য চরম বিপর্যয়কর হবে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন প্রশাসন তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতম মিত্র ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য শেষ পর্যন্ত কতটা বাধ্য করতে পারবে বা আদৌ সেই সদিচ্ছা তাদের আছে কিনা। ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের সাথে পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, আবার অন্যদিকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখছে। এই পরস্পরবিরোধী ও দ্বিমুখী নীতি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে যা সহজে দূর করা সম্ভব হবে না। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে তেল আবিবের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করে এই ইসরায়েলি হামলা থামাতে ব্যর্থ হয়, তবে ইরান স্থায়ীভাবে এই পুরো আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারে। এর ফলশ্রুতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি সর্বাত্মক এবং নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে যা বৈস্মিক অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করবে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন পরাশক্তির প্রভাব বিস্তারের লড়াই যা লেবাননকে একটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। গত ২ মার্চ যখন ইসরায়েল তাদের বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করেছিল, তখন থেকেই মূল লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করা এবং তাদের সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বরং এই আগ্রাসন লেবাননের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাবকে আরও তীব্র করেছে এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থানকে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী করেছে। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও এখন এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার শিকার হচ্ছে যা পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলেছে।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইরান-মার্কিন চুক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে যা এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। ওয়াশিংটনের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন যে ইরানের সাথে এই ধরনের সমঝোতা ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ঝুঁких মধ্যে ফেলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে দুর্বল করবে। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো অবস্থান নিতে দ্বিধাবোধ করছে। অন্যদিকে ইরানও তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আমেরিকার সামনে খুব বেশি নরম অবস্থান দেখাতে পারছে না। এই দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ইসরায়েলের একগুঁয়েমি মিলে লেবাননকে একটি আন্তর্জাতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত করেছে যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন উৎসর্গ করা হচ্ছে।

লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ক্রমাগত ভয়াবহ বোমাবর্ষণ এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকণ্ঠ থেকেশুরু করে সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত লাখ লাখ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে যার ফলে নিহতের সংখ্যা প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। এই মানবিক সংকটের মুখেও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। লেবাননের এই ভাগ্য এখন ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার জটিল কূটনৈতিক দরকষাকষি এবং তেল আবিবের আগ্রাসী সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে যা আগামী সপ্তাহগুলোতে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ এবং ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে নির্ধারণ করবে।

banner
Link copied!