ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সোমবার নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবনের দিকে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভ ও পদযাত্রার ডাক দিয়েছে হাজারো তরুণ। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি নামের একটি যুব সংগঠনের নেতৃত্বে এই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কারিগরি ত্রুটির প্রতিবাদে বিগত প্রায় এক মাস ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় এই আন্দোলন চলছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটিতে শিক্ষাখাতের এমন বিপর্যয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই ছাত্র বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পায় শনিবার, যখন পুলিশ ৫৯ বছর বয়সী অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তর থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। তিনি এই তরুণদের প্রতি সংহতি জানিয়ে টানা বিশ দিন ধরে অনশন করছিলেন। পুলিশের দাবি, আদালতের নির্দেশ ও ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতির কারণেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসার নামে সরকার মূলত তাকে অবৈধভাবে আটকে রেখেছে। এই ঘটনার পরপরই ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং মোদী সরকারের পদত্যাগের দাবি তুলে সমর্থকদের সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদ ভবন ঘেরাও করার আহ্বান জানান।
অভিজিৎ দিপকের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার তরুণ একত্রিত হতে শুরু করায় নয়াদিল্লিতে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন অধিকার গোষ্ঠী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই পদযাত্রার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং সাধারণ মানুষকে এতে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। বেকার যুবক ও সরকারের সমালোচকদের ভারতের প্রধান বিচারপতি অবজ্ঞা করে তেলাপোকা বা পরজীবী বলে মন্তব্য করার পরই মূলত এই ব্যঙ্গাত্মক ককরোচ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, যেখানে তিনি জানতে চান সব তেলাপোকা এক হলে কী হবে। এই সাধারণ কৌতুকটি দ্রুত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তার তৈরি করা ওয়েবসাইটে লাখো মানুষ যুক্ত হন। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে তিনি এই ইন্টারনেটভিত্তিক ক্ষোভকে রাজপথের আন্দোলনে রূপ দেন। তাদের প্রাথমিক দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বরখাস্ত, কারণ তার মেয়াদে বারবার প্রশ্নফাঁসের কারণে হতাশায় ভুগে গত এক দশকে বহু শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের ধারাবাহিক পতনের এই সময়ে তরুণদের এই সংঘবদ্ধ ছাত্র বিক্ষোভ মোদী সরকারের জন্য একটি নজিরবিহীন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাধারণ একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য থেকে শুরু হওয়া এই ককরোচ আন্দোলন এখন ভারতের আপামর ছাত্র সমাজের অধিকার আদায়ের মূল মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে বেকারত্ব, চরম বৈষম্য এবং ধর্মীয় উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এখন সোমবারের এই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
