ইরান বর্তমানে এক জটিল কৌশলগত পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের তীব্র সামরিক সংঘাত চলছে, অন্যদিকে তেহরান তাদের আক্রমণ পরিচালনার জন্য বেছে নিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালালেও, ইরান সরাসরি মার্কিন রণতরী বা ইসরায়েলের দিকে বড় ধরনের কোনো আক্রমণ পরিচালনা করা থেকে বিরত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তেহরানের একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা, যার উদ্দেশ্য হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, কিন্তু যুদ্ধের পরিধিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বড় হতে না দেওয়া।
ওয়াশিংটন ইরানের রেলপথ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ এবং পানির অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালালেও, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এর জবাবে কুয়েত এবং বাহরাইনের বেসামরিক বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের পেছনে সুস্পষ্ট সামরিক যৌক্তিকতা রয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াস হানা জানিয়েছেন, মার্কিন নৌ-সম্পদ লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এগুলোর চারপাশে অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া সরাসরি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত করলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিধ্বংসী পাল্টা জবাব আসবে, যা ইরান বর্তমানে এড়াতে চাইছে।
তবে তেহরান কেন প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাঘিয়ানি দাবি করেছেন যে, উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে কুয়েত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর জন্য তাদের মাটি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে দেশ থেকে আক্রমণ পরিচালিত হয়, সেই দেশের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে। তার মতে, ওয়াশিংটন সচেতনভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়িয়ে দিচ্ছে যাতে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলা করতে না পারে।
অন্যদিকে এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শাইজি। তিনি ইরানের এই ধরনের অভিযোগকে নিছক প্রচার প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মার্কিন হামলাগুলো পরিচালিত হচ্ছে উপকূল থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং আব্রাহাম লিংকন থেকে। কুয়েতসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই তেহরানকে জানিয়ে রেখেছে যে তাদের ভূখণ্ড মার্কিন হামলার জন্য ব্যবহৃত হবে না।
অধ্যাপক আল-শাইজির মতে, ইরান খুব ভালো করেই জানে যে মার্কিন রণতরীগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কিন্তু তারা সরাসরি মার্কিন সেনাদের হত্যা করার পরিণতি নিয়ে ভীত। তেহরান ভয় পায় যে, যদি একজন মার্কিন সেনাও তাদের হামলায় নিহত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে জবাব আসবে তা তাদের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনবে। এই কৌশলগত অবস্থান থেকেই তারা তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে এক ধরণের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
