আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে শুরু হয়েছে সংস্থাটির বার্ষিক সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই সাধারণ বিতর্কে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, যেখানে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান।
উদ্বোধনী দিনে বিশ্বের প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের এই মঞ্চে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
সাধারণ বিতর্ক চলবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার পর্যন্ত, এবং রবিবার বিরতির পর ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার অধিবেশন পুনরায় শুরু হয়ে বাকি বক্তাদের বক্তব্য সম্পন্ন হবে। প্রতিদিন দুটি নির্ধারিত পর্বে এই বৈঠক পরিচালিত হচ্ছে, যার প্রথমটি স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিট এবং দ্বিতীয়টি বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিদের জন্য বক্তব্য প্রদানের একটি ঐচ্ছিক ১৫ মিনিটের সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বনেতারা তা অতিক্রম করে থাকেন। অধিবেশনের সূচনালগ্নে বিদায়ী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর আনুষ্ঠানিক বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করবেন, যা মহাসচিব হিসেবে তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা হতে যাচ্ছে। গুতেরেসের বক্তব্যের পরপরই সভাপতি খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিতর্কের উদ্বোধন করবেন।
দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ঐতিহ্য অনুসারে সাধারণ বিতর্কে প্রথম ভাষণ দেয় লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল।
১৯৫৫ সাল থেকে প্রচলিত এই রীতির পর আয়োজক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে বক্তব্য প্রদান করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকালে ব্রাজিলের বক্তব্যের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঞ্চে ভাষণ দিতে আসবেন বলে সময়সূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর বক্তব্যের ক্রম নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে তাদের প্রতিনিধির রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা, নিজস্ব পছন্দ এবং ভৌগোলিক ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদেরও নিজস্ব কূটনৈতিক মর্যাদা অনুসারে বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ইস্ট রিভার সংলগ্ন জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত এই সম্মেলন কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আধুনিক কূটনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও সূচনালগ্নে সাধারণ পরিষদের প্রথম কয়েকটি সম্মেলন লন্ডন এবং প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর আগে ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা না দেওয়ায় তৎকালীন সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্থানান্তর করতে হয়েছিল।
চলতি বছরও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে সাধারণ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটাভুটিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আগে থেকে ধারণ করা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য রাখবেন। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ প্রশাসন। আন্তর্জাতিক আইন ও সদর দফতর চুক্তি অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের কোনো বাধা ছাড়াই সম্মেলনে যোগদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে আয়োজক দেশের ওপর।
এবারের ৮১তম সাধারণ পরিষদের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক রূপান্তর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে সবার জন্য কার্যকর একটি বিশ্ব সংস্থা গড়ে তোলা। সাধারণ বিতর্কের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উত্তরণ সংক্রান্ত সম্মেলন, উন্নয়নের অধিকার ঘোষণার ৪০ বছর পূর্তি, সমুদ্রপৃষ্ঠের বিপজ্জনক উচ্চতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক মহামারি প্রস্তুতি, বর্ণবাদবিরোধী ডারবান ঘোষণার ২৫ বছর উদযাপন এবং পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনা।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে অবধারিতভাবে উঠে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র সামরিক সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সংকট। একই সাথে বিশ্ব কূটনীতিবিদদের নজর রয়েছে গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচনের দিকে, যাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারী মহাসচিব দায়িত্ব পাননি, যার ফলে এবার সংস্থাটির নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে বেছে নেওয়ার পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের ভেতর জোর দাবি উঠছে।
