দক্ষিণ সুদানে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় ঐক্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সালভা কির। একইসঙ্গে নির্বাচনের অন্তর্বর্তী সময় পার করতে একটি তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তটি দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ থামানো ২০১৮ সালের শান্তি চুক্তির ক্ষমতা ভাগাভাগি কাঠামোর অবসান ঘটিয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার তীব্র শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আইনসভা ও মন্ত্রিপরিষদ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত রাষ্ট্রপতির বিশেষ ডিক্রিতে জানানো হয়, সব ভাইস-প্রেসিডেন্ট, জাতীয় মন্ত্রী ও আঞ্চলিক প্রশাসকদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাহিনীগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। আদেশে বলা হয়েছে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ না নেওয়া পর্যন্ত সালভা কির একাই রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বহাল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
জাতীয় নির্বাচন আইনে সংশোধন এনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পার্লামেন্টে পাস হওয়া নতুন আইনের ফলে স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন কিংবা জাতীয় আদমশুমারি সম্পন্ন করা ছাড়াই আগামী ২২ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ তৈরি হলো। দেশটির প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক জোট শুরু থেকেই এই আইনি পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালেই এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তবে রাজনৈতিক জটিলতা ও প্রস্তুতির অভাবে তা দুই দফা পেছানো হয়। পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে অন্তত চার লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর যে সমঝোতা হয়েছিল, তার অধীনে এখনও স্থায়ী সংবিধানের খসড়া, ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বিদ্রোহী দলগুলোর বাহিনীকে একীভূত করার কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পদক্ষেপকে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দিকে একটি সিদ্ধান্তমূলক অগ্রগতি বললেও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক টিগেরে চাগুতাহ মন্তব্য করেছেন যে নাগরিকদের নির্বিঘ্নে ভোটদান ও প্রার্থিতা নিশ্চিত করার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক দায়িত্ব। অন্যদিকে আইনি বিশ্লেষকেরা ক্ষমতার চরম ভারসাম্যহীনতার বিষয়ে সতর্ক করছেন। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সাবেক সদস্য মাইকেল ওয়ানি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, এই নির্দেশনার পর নির্বাহী পরিষদ বা সংসদীয় নজরদারি ছাড়াই কির একক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলেন।
আইনি কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘসূত্রতার ফাঁক রয়ে গেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। স্বাধীন বিশ্লেষক মাচত আমুওম সতর্ক করে জানান, নতুন বিধিমালার সুযোগ নিয়ে প্রেসিডেন্ট চাইলে নির্বাচন আরও এক বা দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ভোগ করবেন। এর আগে গত সপ্তাহে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ না দেখিয়েই জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই স্থানে গ্যাব্রিয়েল বোল ডেং মাজককে নির্বাচন পরিচালনার নতুন ম্যান্ডেট দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পুরো এই রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস চলছে কঠোর সামরিক পাহারার মধ্য দিয়ে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা ও সাবেক ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট রিয়েক মাচার বর্তমানে গৃহবন্দী অবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি রয়েছেন, যদিও তিনি এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। রাজধানী জুবায় সরকারি প্রশাসনিক এলাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে অতিরিক্ত তল্লাশিচৌকি বসিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীকে তিন দিনের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
