রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট: পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ঢলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০১:১৪ এএম

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট: পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ঢলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে ভিন রাজ্যে কর্মরত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের গ্রামে ফেরার হিড়িক পড়েছে। আর এই ব্যাপকহারে প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে দানা বাঁধছে তীব্র বিতর্ক। বিহার, আসাম, গুজরাট, এমনকি প্রতিবেশী দেশ নেপাল থেকেও হাজার হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে নিজ নিজ জেলায় ফিরছেন। বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রত্যাবর্তন কেবল পারিবারিক আবেগঘন দৃশ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন নির্বাচনী ফলাফল ও ভোটব্যাংকের রাজনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর প্রান্তের জেলাগুলো যেমন—কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিংয়ে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়। শ্রমিকরা দলে দলে বাস, ‘ম্যাজিক ভ্যান’ বা ‘ছোটা হাতি’ ভাড়া করে গ্রামে পৌঁছাচ্ছেন। একইভাবে মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো শ্রমিক-নিবিড় জেলাগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট এই শ্রমিকদের ঘরে ফিরিয়ে আনছে যাতে ভোট নিজেদের অনুকূলে আনা যায়। এমনকি শ্রমিকদের জন্য ‘বিশেষ ট্রেনের’ ব্যবস্থা করার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও সামনে আসছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, পরিযায়ী শ্রমিকরা বাংলার নাগরিক এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে তারা ঘরে ফিরছেন। অন্যদিকে, বিজেপি ও বিরোধী শিবিরের অভিযোগ—তৃণমূল পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের ভাড়া করে রাজ্যে আনছে ভোটব্যাংক অটুট রাখতে। তাদের মতে, কাজ না পেয়ে ভিন রাজ্যে চলে যাওয়া এই শ্রমিকদের প্রতি রাজ্য সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, কেবল ভোটের স্বার্থেই তাদের ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। পাল্টা জবাবে তৃণমূল বলছে, উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের ফেরার পেছনে বিজেপির ইন্ধন রয়েছে যাতে তারা নির্দিষ্ট মেরুকরণের সুবিধা নিতে পারে।

শ্রমিকদের এই ঢল উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দও কিছুটা ব্যাহত করছে। কোচবিহারের মতো সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশের ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয় যাচাই এবং কোনো বিশেষ রাজনৈতিক ইন্ধনে তারা আসছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের একাংশের দাবি, রুটিরুজির টানে বাইরে থাকলেও নিজেদের এলাকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভোট দেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং সে কারণেই তারা অনেক কষ্টে রাজ্যে ফিরছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উত্তরবঙ্গ ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। গত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভোটব্যাংকের গতিপ্রকৃতি জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেয়। ফলে ভোটের আগের এই কয়েকদিন শ্রমিকদের ঘরে ফেরা নিয়ে যে বিতর্ক দানা বাঁধছে, তা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আরও জোরালো হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রত্যাবর্তন কোন দলের পালে হাওয়া দেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

banner
Link copied!