শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

ভূরাজনৈতিক নতুন মেরুকরণ

ট্রাম্প-শি বৈঠক: চাপে পড়ছে গ্লোবাল সাউথ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

ট্রাম্প-শি বৈঠক: চাপে পড়ছে গ্লোবাল সাউথ

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শীর্ষ বৈঠক শেষ হয়েছে বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। বোমারু বিমানের প্রদর্শনী এবং প্রটোকলের জাঁকজমক দিয়ে সম্মেলন সাজানো হলেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর নজর ছিল অন্য জায়গায়। বেইজিংয়ের তুলে ধরা গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার বার্তাটি রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক হিসেব-নিকেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পরাশক্তির এই প্রদর্শনীতে মূল সংকট গ্লোবাল সাউথের।

বৈঠক শেষে বেইজিং কোনো সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে কূটনৈতিক সুরক্ষার বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রেখে মিত্রদের ওপর পক্ষ বাছাইয়ের ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। উন্নয়নশীল বিশ্বকে চীনের প্রভাব বলয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখার মার্কিন তাগিদের বিপরীতে স্বয়ং ট্রাম্প যখন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে নৈশভোজ সারছেন, তখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে নতুন হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনীতিতে এই বৈপরীত্য সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

চলমান ইরান সংকটের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক করতে বেইজিংয়ের সহায়তা প্রত্যাশা করেছিল হোয়াইট হাউস। চীন যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির কথা বললেও তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সামরিক রসদের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করলেও সংকট ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি বাজারের সুরক্ষায় বেইজিংয়ের উপস্থিতি কাজে লাগাতে চাইছে। কোনো সামরিক ঘাঁটি বা সৈন্য না পাঠিয়ে বেইজিংয়ের এই মধ্যস্থতার ভূমিকা মিসর ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় দ্বিধা তৈরি করেছে ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা।

একদিকে মিত্রদের বেইজিং থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে, অন্যদিকে শীর্ষ দুই অর্থনীতি নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধাক্কা ও নতুন শুল্কের বোঝা ছোট অর্থনীতির ঘাড়েই চাপছে। এই বাস্তবতায় ভারত রাশিয়ার তেল ক্রয়ের পাশাপাশি মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রাখছে। একই সমীকরণে ইন্দোনেশিয়া উভয় শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করছে এবং ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা ব্রিকস জোটকে ব্যবহার করছে নিজস্ব সুরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন নিয়ন্ত্রণ লড়াই।

ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে প্রযুক্তি সংলাপ চালিয়ে গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক রূপরেখা নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোনো সক্রিয় ভূমিকা থাকছে না। এই প্রযুক্তিগত পরাশ্রয়ী অবস্থান ভাঙতে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তুলছে এবং সাংহাই ভিত্তিক নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা কাঠামোর মতো বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন কোনো নির্দিষ্ট জোটে বন্দি না থেকে উভয় পক্ষের সাথে দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি টিকিয়ে রাখার কৌশল গ্রহণ করছে।

banner
Link copied!