যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান পরোক্ষ আলোচনার প্রধান নেতার পদত্যাগ এবং পাকিস্তানে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। শুক্রবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচক দলের প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় পারমাণবিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন তিনি। তেহরানের কট্টরপন্থি শিবিরের পক্ষ থেকে তাকে তিরস্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।
গালিবাফের এই প্রস্থান এমন এক সময়ে ঘটল যখন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের প্রস্তুতি চলছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গালিবাফের জায়গায় এখন কট্টরপন্থি নেতা সাঈদ জালিলি কিংবা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নিতে পারেন।
বিশেষ করে আরাঘচি নিজে এই আলোচনার নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে এই রদবদল দেশটির ভবিষ্যৎ বিদেশনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পাড়ায় এখন সাজ সাজ রব। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে শুক্রবার রাতেই পাকিস্তানের রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলো দাবি করছে, এই সফরটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের দূরত্ব কমানোর একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এর আগে আরাঘচি পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে টেলিফোনে বিস্তারিত আলাপ করেছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুই নেতার ফোনালাপে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের প্রেক্ষাপটে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইসহাক দার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ইসলামাবাদে এই আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে পর্দার আড়ালে বড় ধরনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও লক্ষ্য করা গেছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অন্তত নয়টি মার্কিন বিমান ইসলামাবাদে অবতরণ করেছে, যেগুলোতে উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাকর্মী ছিল বলে জানানো হয়েছে।
তবে ইরানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে তেহরানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন।
যদিও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কথোপকথনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। গালিবাফের পদত্যাগ তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইকে যেমন সামনে এনেছে, তেমনি ইসলামাবাদে আরাঘচির সফর একটি নতুন কূটনৈতিক পথরেখা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই আলোচনার টেবিলে পারমাণবিক ইস্যু কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
