ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে মিত্রদের সমর্থনের অভাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের চরম অসন্তোষের মধ্যেই ন্যাটোর পক্ষ থেকে একটি বড় ঘোষণা এসেছে। আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটটি সাফ জানিয়েছে যে, কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে জোট থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার মতো কোনো বিধান বর্তমান চুক্তিতে নেই।
মূলত স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিবেদনের পরপরই ন্যাটো এই অবস্থান পরিষ্কার করল।
সংবাদ সংস্থা Reuters-এর একটি প্রতিবেদনে পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেলের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন না করায় ওয়াশিংটন তার মিত্র দেশগুলোকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
এই ইমেলে স্পেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ আটলান্টিকে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের অধিকারের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনা এই দ্বীপপুঞ্জটিকে দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।
ন্যাটোর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিবিসির কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন যে, জোটের প্রতিষ্ঠাতা সনদে সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো ধারা রাখা হয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও এই প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দিতে নারাজ।
তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা কোনো ইমেলের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন না। স্পেন সবসময় আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকে মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
এদিকে পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য সবকিছু করলেও বিপদের সময় তারা পাশে থাকছে না। তিনি মিত্র দেশগুলোকে ‘কাগজের বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কিছু বিকল্প নিশ্চিত করতে চান যেখানে মিত্ররা কেবল সুযোগ নেবে না বরং নিজেদের দায়িত্বও পালন করবে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই ন্যাটোর ভেতর এই টানাপোড়েন শুরু হয়। স্পেন তাদের ভূখণ্ডের বিমানঘাঁটিগুলো ইরান বিরোধী অভিযানে ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে— নেভাল স্টেশন রোটা এবং মরন এয়ার বেস। স্পেনের এই অস্বীকৃতি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছে।
একই সময়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও জানিয়েছেন যে, ইরানের বন্দর অবরোধ বা যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের স্বার্থের অনুকূলে নয়। যদিও যুক্তরাজ্য মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে এবং তাদের বিমান বাহিনী ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার অভিযানে অংশ নিয়েছে, তবুও তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে ইচ্ছুক নয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একটি সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপের বেশি প্রয়োজন। অথচ ইউরোপীয়রা কেবল বড় বড় আলোচনা সভাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তার মতে, দশকের পর দশক ধরে ইউরোপ এবং এশিয়া মার্কিন নিরাপত্তার সুবিধা ভোগ করেছে, কিন্তু এই ‘বিনামূল্যে সুবিধা নেওয়ার দিন’ এখন শেষ।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং জার্মানি অবশ্য স্পেনের সদস্যপদ নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে জানিয়েছে। তারা ন্যাটোকে একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান স্তম্ভের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
বর্তমানে স্পেন ইস্যুতে ন্যাটোর ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমা সামরিক জোটের ঐক্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
