কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক আপডেট পেশ করেছেন, যেখানে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের দামামার মধ্যেও দেশটির অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার অটোয়ায় পার্লামেন্টে উপস্থাপিত এই আপডেটে দেখা গেছে, সরকারের বাজেট ঘাটতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহের ফলে কানাডার অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়েছে বলে বিবিসি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি এই পরিস্থিতিকে সরকারের সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অর্থনৈতিক আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কানাডার বাজেট ঘাটতি ৬৬.৯ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারে নেমে এসেছে, যা গত শরতের বাজেটে ৭৮.৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
এই বিপুল পরিমাণ সাশ্রয় সরকারকে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি সংবাদ সম্মেলনে জানান, অনেকগুলো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলেই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কানাডা বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল মজুতদার দেশ হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের চড়া বাজার থেকে দেশটি সরাসরি লাভবান হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মোকাবিলায় ঢাল হিসেবে কাজ করছে বলে সরকারের দস্তাবেজে জানানো হয়েছে।
এই বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো কানাডা স্ট্রং ফান্ড নামে একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল বা সোভারেন ওয়েলথ ফান্ড গঠন। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ে শুরু হওয়া এই ফান্ড অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করবে।
প্রথমবারের মতো কানাডীয় সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি এই ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অংশীদার হতে পারবেন। সরকারের লক্ষ্য হলো এই ফান্ডের মাধ্যমে কানাডাকে একটি শক্তিশালী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করবে।
শ্রম বাজারের সংকট মোকাবিলায় সরকার দক্ষ শ্রমিক তৈরির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় এক লাখ নতুন দক্ষ শ্রমিক প্রশিক্ষণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এককালীন গ্রোসারি রিবেট বা মুদি ভর্তুকি এবং জ্বালানি তেলের ওপর সাময়িক শুল্ক ছাড়ের ঘোষণাও কার্যকর থাকছে।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, এই পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে এমন ভর্তুকি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলে তা দেখার বিষয়।
তবে এই ইতিবাচক খবরের পাশাপাশি কিছু সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শুল্ক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত কানাডার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বর্তমানে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং বাণিজ্য যুদ্ধ যদি তীব্রতর হয়, তবে কানাডার প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাধা কানাডার বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়ের পুয়ালিভ্রে সরকারের এই বাজেটের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী কার্নির লাগামহীন ব্যয়ই দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
পুয়ালিভ্রে কার্নিকে অবিলম্বে বাজেট ভারসাম্যপূর্ণ করার এবং সরকারি ব্যয় আরও কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, ক্রমবর্ধমান ঋণ দীর্ঘমেয়াদে কানাডার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়েছে, তারা কেবলমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের জন্যই এই ঘাটতি বজায় রাখছে এবং অর্থনীতি সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
