রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ইরানে হামলার পরিকল্পনা ও তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ইরানে হামলার পরিকল্পনা ও তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা

ইরানে নতুন করে শক্তিশালী সামরিক হামলার পরিকল্পনার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেন্টাগন ও সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের পক্ষ থেকে নতুন সামরিক বিকল্প নিয়ে ব্রিফিং দেওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১২৬ দশমিক ১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। 

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর গত চার বছরে তেলের বাজারে এমন ভয়াবহ উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি।সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। 

এই হামলার মূল লক্ষ্য হবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা। এছাড়া মার্কিন জেনারেলরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থলসেনা মোতায়েন করার একটি বিকল্প প্রস্তাবও দিতে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য যে বর্তমানে এই কৌশলগত জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে যার ফলে বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে।

তেলের বাজারের এই অস্থিরতা কেবল ব্রেন্ট ক্রুডেই সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দামও ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে। লিবিয়াম স্ট্র্যাটেজিক ডেটার তথ্যমতে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন যে শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। 

গোল্ডম্যান স্যাকস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ৪ শতাংশ তেল রপ্তানি হতে পারছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ফ্লোরিডায় জ্বালানি খাতের নির্বাহীদের সাথে এক বৈঠকে ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরও কয়েক মাস চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ইরানের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে উগ্র শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন যে তেহরান বর্তমানে চরম চাপে রয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করা পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকবে। 

সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা ইতোমধ্যে ৪২টি তেলবাহী জাহাজকে অবরোধ লঙ্ঘন করতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ইরানের প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ৪১টি ট্যাংকার সাগরে আটকা পড়ে আছে যেগুলোর বাজারমূল্য ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামান্যতম সামরিক উত্তজনাও বিশ্ব অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইয়ো হুই চুয়া জানিয়েছেন যে তেলের বাজারে ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। 

যদি এই সংকট আগস্ট মাস পর্যন্ত গড়ায় তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১৯০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে সতর্ক করেছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও চরম অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ইসরায়েলি উপস্থিতির পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। তেহরান হুমকি দিয়েছে যে মার্কিন অবরোধ বহাল থাকলে তারা ওই জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেবে না। 

ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউস ও সেন্টকমের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিফিংয়ের বিষয়ে মন্তব্য করা না হলেও বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যেই বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কায় নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।

banner
Link copied!