জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক তিক্ত বাকযুদ্ধের জেরে জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে। পেন্টাগনের এই পদক্ষেপকে ইরান যুদ্ধ এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাড়তে থাকা দূরত্বের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নির্দেশ অনুযায়ী এই সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান নিয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে ৫ হাজার সেনাকে জার্মানি থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। বর্তমানে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৬ হাজার সক্রিয় সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা জাপানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
সেনা প্রত্যাহারের এই নাটকীয় ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি অনুষ্ঠানে মের্জ বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধের কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানীদের দ্বারা অপমানিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট বহির্গমন কৌশল নেই এবং তেহরান আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনকে পর্যুদস্ত করছে।
মের্জের এই মন্তব্যের জবাবে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, মের্জ জার্মানির অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছেন এবং তিনি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জনে সহায়তা করার মানসিকতা পোষণ করেন। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি কেবল জার্মানি নয়, ইতালি এবং স্পেন থেকেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। ট্রাম্পের মতে, এই দেশগুলো হরমুজ প্রণালী সংকট বা ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো কার্যকর সহায়তা করছে না।
ঐতিহাসিকভাবেই ট্রাম্প ন্যাটো জোট এবং মিত্রদের সামরিক ব্যয়ের কট্টর সমালোচক। ২০২০ সালেও তিনি জার্মানি থেকে ১২ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে বাতিল করেছিলেন। তবে বর্তমান মের্জ সরকারের অধীনে জার্মানি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে জার্মানি তাদের জিডিপির ৩.১ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে, যা ন্যাটোর ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। তাসত্ত্বেও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ট্রাম্প এই কঠোর পথে হাঁটলেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রত্যাহারের ফলে জার্মানিতে থাকা একটি ব্রিগেড কমব্যাট টিমকে সরিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাইডেন প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি দূরপাল্লার ফায়ার ব্যাটালিয়ন মোতায়েনের যে কথা ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বার্লিনের অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি মূলত ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।
জার্মানিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতীক নয়, বরং এটি আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের প্রধান লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে রামস্টেইন বিমান ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অপারেশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হলে তা ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তা সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
