ইরান যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে চলমান তিক্ততার জেরে জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের এই ঘোষণা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভেতরে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শনিবার এক বিবৃতিতে ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, তারা মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখছেন। পেন্টাগনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে জার্মানির অবস্থান এবং সামরিক জোটে দেশটির অবদান নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। সম্প্রতি জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এক মন্তব্যে বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে ‘অপমানিত’ হচ্ছে। এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা আক্রমণ করে জানান, মার্জের উচিত অন্যের সমালোচনা না করে নিজের ‘ভেঙে পড়া দেশের’ দিকে নজর দেওয়া। এছাড়া ট্রাম্প ন্যাটোকে একটি ‘কাগুজে বাঘ’ এবং ‘সম্পূর্ণ অকেজো’ সংস্থা হিসেবেও অভিহিত করেন।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, ইউরোপে মার্কিন সামরিক শক্তির অবস্থান পর্যালোচনার অংশ হিসেবেই এই ৫ হাজার সৈন্যকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্রিগেড কমব্যাট টিম এবং দূরপাল্লার ফায়ার ব্যাটালিয়ন প্রত্যাহারের তালিকায় থাকতে পারে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জার্মানি থেকে সেনা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের কৌশলগত নজর এখন চীনের দিকে ঘুরিয়ে নিতে চাইছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড জেনসেন আল জাজিরাকে বলেন, এই পরিবর্তন ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, ওয়াশিংটন এখন তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কেবল আদান-প্রদানের বা ‘ট্রানজ্যাকশনাল’ ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়।
এদিকে জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস এই সিদ্ধান্তকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে করছেন না। তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি আগে থেকেই এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার মতে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই নিতে হবে। গত বছর নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ-এ অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো তাদের মোট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত সামরিক খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। জার্মানি ইতোমধ্যে তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে শতকোটি ইউরো বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
ন্যাটোর মুখপাত্র হার্টও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন এই সিদ্ধান্ত ইউরোপকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও স্বনির্ভর হতে বাধ্য করবে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ইউক্রেন ও ইরানের সংকটের মাঝপথে এই সেনা প্রত্যাহার রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষকে বাড়তি সুবিধা দেবে। ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাট শিবির এবং রিপাবলিকান পার্টির একটি অংশও ট্রাম্পের এই মুডের ওপর নির্ভরশীল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল জার্মানি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের মিত্রদের প্রতি আমেরিকার দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
বাস্তবতা হলো, জার্মানির স্টুটগার্টে অবস্থিত ইউএস ইউরোপীয় কমান্ড এবং আফ্রিকা কমান্ডের সদর দপ্তরগুলো এই অঞ্চলের সামরিক অপারেশনগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। র্যামস্টেইন বিমান ঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জার্মানিকে মার্কিন সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে। ফলে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্পর্কে কতটা স্থায়ী ফাটল ধরায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
