মেক্সিকোর সিনালেয়া রাজ্যের গভর্নর রুবেন রোচা মোয়া পদত্যাগ করেছেন। মাদক পাচারের গুরুতর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একটি বিশাল অভিযোগপত্র দাখিল করার পরপরই এই নাটকীয় ঘটনাটি ঘটল। গত শুক্রবার রাতে পোস্ট করা একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তায় রোচা মোয়া তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন যে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার লড়াইয়ে মনোযোগ দিতে তিনি আপাতত ‘সাময়িক ছুটি’ বা পদত্যাগ করছেন। এই ঘটনাটি কেবল মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয় বরং ওয়াশিংটন ও মেক্সিকো সিটির মধ্যকার ভঙ্গুর কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মেক্সিকোর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে, তখন একজন ক্ষমতাসীন গভর্নরের এই সরে দাঁড়ানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের দাখিল করা এই অভিযোগপত্রে রোচা মোয়া ছাড়াও আরও ৯ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা সিনালেয়া ড্রোন কার্টেলের চোরাচালান কার্যক্রমে সরাসরি সহায়তা করেছেন। বিনিময়ে এই প্রভাবশালী কার্টেল রোচা মোয়াকে রাজনৈতিক সমর্থন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ হিসেবে প্রদান করেছে। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে যে ২০২১ সালের নির্বাচনে রোচা মোয়ার বিরোধীদের অপহরণ ও হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং কার্টেল সদস্যরা তার বিপক্ষে পড়া ব্যালট পেপার চুরি করেছিল। রোচা মোয়া মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউমের প্রগতিশীল মোরেনা পার্টির একজন প্রভাবশালী সদস্য। তাই তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ মোরেনা পার্টির ভাবমূর্তির ওপর বড় ধরণের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিডিও বার্তায় রোচা মোয়া তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন যে তার বিবেক পরিষ্কার। তিনি দাবি করেন যে তিনি তার পরিবার বা জনগণের সঙ্গে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না। তবে কেবল রোচা মোয়া একাই নন সিনালেয়ার রাজধানী কুলিয়াকানের মেয়র হুয়ান ডি ডিওস গমেজ মেন্ডিভিলও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধেও একই ধরণের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি এবং রোচা মোয়া উভয়েই দাবি করেছেন যে এই অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে মেক্সিকোর এই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের দুই শীর্ষ নেতার একসঙ্গে সরে দাঁড়ানো দেশটির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি শুরু থেকেই তার দলের সদস্যদের পক্ষ নিয়েছেন এবং মার্কিন অভিযোগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শিনবাউম দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের পক্ষে কোনো শক্তিশালী বা অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তার মতে এই অভিযোগপত্রটি অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তিনি মেক্সিকোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন যে যদি সত্যই কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায় তবে মেক্সিকোর আইনি ব্যবস্থার অধীনেই বিচার হবে। বিদেশের মাটিতে কোনো মেক্সিকান নাগরিককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার করতে দেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। শিনবাউম স্পষ্ট করে বলেছেন যে মার্কিন বিচার বিভাগের এই পদক্ষেপটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।
এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতি। ২০২৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকোর অভিবাসন ও মাদক পাচার রোধে নজিরবিহীন চাপ তৈরি করেছেন। তিনি মেক্সিকান পণ্যের ওপর ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করেছেন এবং লাতিন আমেরিকার ড্রোন কার্টেলগুলোকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই সামরিক ঘরানার নীতি মেক্সিকো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোরেনা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডোরও সবসময় মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছিলেন। শিনবাউম সেই উত্তরাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে এখন ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে একজন ক্ষমতাসীন গভর্নরকে অভিযুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চরম পদক্ষেপ। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ ভান্ডা ফেলবাব-ব্রাউন আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে মেক্সিকোর নির্বাচিত কর্মকর্তাদের সরাসরি মাদক সম্রাটদের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিশাল অবনতি। এর আগে ২০২৪ সালে সিনালেয়া কার্টেলের নেতা ‘এল মায়ো’ জাম্বাদাকে টেক্সাস থেকে গ্রেফতার করার পর থেকেই সিনালেয়া রাজ্যে এক ধরণের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই সময় এল মায়ো দাবি করেছিলেন যে তাকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এতে গভর্নরের হাত থাকতে পারে। রোচা মোয়া তখন সেই দাবি অস্বীকার করেছিলেন কিন্তু এখন মার্কিন আদালত সেই যোগসূত্রটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট শিনবাউম এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে তাকে তার রাজনৈতিক দলের নেতাদের সুরক্ষা দিতে হচ্ছে অন্যদিকে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপ ও ট্যারিফ যুদ্ধ সামলাতে হচ্ছে। মেক্সিকোর অর্থনীতি এখন বড় ধরণের ধসের মুখে রয়েছে এবং ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী যদি মেক্সিকো এই কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে না দেয় তবে সীমান্ত ইস্যুতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন তিনি। অন্যদিকে মোরেনা পার্টির ভেতরেও বিভক্তি দেখা দিতে পারে যদি শিনবাউম গভর্নরের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেন।
পরিশেষে সিনালেয়ার এই রাজনৈতিক ঝড় কেবল রোচা মোয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় নয় বরং এটি উত্তর আমেরিকার ভূ-রাজনীতির একটি গভীর ফাটল। মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যকার এই লড়াই আগামী দিনগুলোতে আরও তিক্ত হয়ে উঠতে পারে। মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এখন এই অভিযোগগুলো নিয়ে নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। সেই তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে রোচা মোয়াকে শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হতে হবে কি না। তবে গ্লোবাল ড্রাগ পলিসি এবং মার্কিন হস্তক্ষেপের এই সংমিশ্রণ গাজা বা লেবাননের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার অস্থিরতার মতোই মধ্য আমেরিকার এই অঞ্চলে এক নতুন সংকট তৈরি করেছে যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
