শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালীতে সংঘর্ষ: ট্রাম্প কি পারবেন যুদ্ধ থামাতে?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

হরমুজ প্রণালীতে সংঘর্ষ: ট্রাম্প কি পারবেন যুদ্ধ থামাতে?

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘাতের কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর আছে। তবে রণক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি এবং দুই দেশের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্য একটি ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর এই লড়াইয়ে দুই পক্ষই একে অপরকে উসকানিদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছে এবং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের তিনটি যুদ্ধজাহাজের ওপর ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছোট নৌযানের মাধ্যমে অতর্কিত হামলা চালায়। একে একটি উসকানিহীন হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে পেন্টাগন। এর জবাবে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারগুলোতে পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যে ইরান আজ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খেলা করেছে। তিনি আরও দাবি করেন যে মার্কিন বাহিনীর হামলায় ইরানের একাধিক ছোট স্পিডবোট ধ্বংস হয়েছে এবং সেগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে সমুদ্রের তলে তলিয়ে গেছে।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক কমান্ড মার্কিন দাবি অস্বীকার করে বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়া একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্য একটি বেসামরিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া ইরানের উপকূলীয় এলাকা বন্দর খামির, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালানোর অভিযোগও এনেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা মার্কিন বাহিনীর এই আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। একই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্রিয় ছিল।

এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার খবর আসছিল। মাত্র একদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা চলছিল এবং পাকিস্তান সরকার এই যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে হোয়াইট হাউস ইরানের সাথে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছিল যা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি ফ্রেমওয়ার্ক।

তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক মতভেদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের এই ১৪ দফার প্রস্তাবকে একটি ইচ্ছার তালিকা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এক্স প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে সতর্ক করে দিয়েছেন যে ইরানের আঙ্গুল এখন ট্রিগারে রয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্তগুলো মেনে না নেয় তবে ইরান এমন এক কঠোর জবাব দেবে যা তাদের অনুশোচনার কারণ হবে। এই সামরিক ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে যে শান্তি আলোচনার টেবিলে বসার আগে দুই পক্ষই নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে বারবার শান্তিচুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করলেও তার সুর ছিল যথেষ্ট আক্রমণাত্মক। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যদি ইরান দ্রুত শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর না করে তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আরও ভয়াবহ এবং হিংসাত্মকভাবে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। ট্রাম্প কয়েকদিন আগেই দাবি করেছিলেন যে ইরানের সাথে যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর এই সংঘর্ষ এবং তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ সেই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে যে এই সাম্প্রতিক সংঘাতে ইসরায়েলের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই যা এই লড়াইকে বিশুদ্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ রেখেছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা এই জলপথের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। ফলে সেখানে সামরিক অস্থিরতা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি টিকে থাকার কথা বলছেন অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লড়াই চলছে। এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি নির্দেশ করে যে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য এখন অত্যন্ত সরু একটি সুতার ওপর ঝুলে আছে। পাকিস্তান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন কোনো সমাধানের পথ দেখাতে পারেন কি না সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থান এবং আঙ্গুল ট্রিগারে থাকার ঘোষণা শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাকে ক্রমশ ক্ষীণ করে তুলছে।

যেকোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। হরমুজ প্রণালীর এই ঘটনায় দুই দেশই ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দিচ্ছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা উসকানিহীন হামলার শিকার হয়েছে সেখানে ইরান বলছে তারা তাদের ট্যাংকার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। এই তথ্যযুদ্ধের মাঝে সত্য বের করে আনা কঠিন হলেও এটি স্পষ্ট যে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এখন কেবল নামমাত্র টিকে আছে। সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা ব্যর্থ হলে এই অঞ্চল পুনরায় এক দীর্ঘমেয়াদী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে পড়তে পারে যা এড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

banner
Link copied!