ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে রোমে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় ফাটল ধরার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শুক্রবার রোমের পালাজ্জো চিগিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরান যুদ্ধ এবং পোপ লিও-কে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্পের সঙ্গে মেলোনির বর্তমান এই দূরত্ব ইউরোপীয় রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
মার্কো রুবিও দুই দিনের সফরে ইতালিতে এসেছেন মূলত ওয়াশিংটন ও রোমের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমিত করতে। উল্লেখ্য, ইরান ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইতালি। বিশেষ করে গত মাসে সিসিলির সিগোনেলা বিমানঘাঁটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। ইতালীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে এই ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য যে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল, তা তারা দেননি। ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তো সতর্ক করেছেন যে এই সংঘাত বৈশ্বিক নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করছে এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বৈঠকের আগে রুবিও ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির সঙ্গেও কথা বলেন। তাজানি আলোচনার পর এক বিবৃতিতে জানান যে ইউরোপের যেমন আমেরিকা প্রয়োজন, আমেরিকারও তেমনি ইউরোপ ও ইতালিকে প্রয়োজন। তবে পর্দার আড়ালের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং এর ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা মেলোনি সরকারকে প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলেছে। আগামী বছরের জাতীয় নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সঙ্গে মেলোনির অতি-ঘনিষ্ঠতা এখন তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ভ্যাটিকান প্রসঙ্গেও মেলোনি তার কঠোর অবস্থান রুবিওর কাছে পরিষ্কার করেছেন। সম্প্রতি পোপ লিও সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা মন্তব্যকে মেলোনি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইতালিতে পোপের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও রুবিও পোপের সঙ্গে তার বৈঠককে ‘খুবই ইতিবাচক’ বলে বর্ণনা করেছেন, তবে ইতালীয় প্রশাসন এখনো ভ্যাটিকান প্রশ্নে ওয়াশিংটনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছে।
আলোচনায় আরও উঠে এসেছে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, ইউরোপীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ এবং কিউবা প্রশ্নে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থান। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকি। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে মেলোনির সংকল্পের অভাব রয়েছে এবং ইতালি থেকে মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। মেলোনি অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ সমর্থন করবেন না, তবে সৈন্য মোতায়েনের সিদ্ধান্তটি একান্তই ওয়াশিংটনের। ইতালির এই ‘ভারসাম্য রক্ষা’র রাজনীতি সামনের দিনগুলোতে ট্রান্স-আটলান্টিক মিত্রতাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
