রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজের তথ্যমতে, আগামী রোববার নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালকে সামনে রেখে আর্জেন্টিনা এবং স্পেন তাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আটচল্লিশ দলের এই মেগা টুর্নামেন্টের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা সরাসরি মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে উভয় দলই সপ্তাহান্তে নিজেদের কৌশলগত দিকগুলো ঝালিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় ধরে রুদ্ধদ্বার অনুশীলনে ঘাম ঝরিয়েছে। দুই দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক ফিটনেস এবং মানসিক দৃঢ়তা পরীক্ষার জন্য কোচরা বিশেষ সেশনের আয়োজন করেছেন, যাতে ফাইনালে কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ না পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রায় আশি হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। স্লোভেনিয়ার অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, ফাইনাল শুরুর আগে একটি বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক শিল্পীরা পারফর্ম করবেন। তবে সব মনোযোগ এখন কেবল মাঠের ফুটবলের দিকেই নিবন্ধিত। লাতিন আমেরিকার দল আর্জেন্টিনার জন্য এই ফাইনালের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়েছেন উনচল্লিশ বছর বয়সী অধিনায়ক লিওনেল মেসি। অনেকেই ধারণা করছেন যে, এটি হয়তো বিশ্বমঞ্চে তার শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে এবং তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মতো দলকে শিরোপা জেতানোর লক্ষ্যে মাঠে নামবেন। এবারের টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের লড়াই এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অদম্য মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে।
অন্যদিকে, স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ফুটবলীয় দর্শন নিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে। পুরো নকআউট পর্বে তারা বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে সুশৃঙ্খল পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে কাবু করেছে। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে দুই শূন্য গোলে হারিয়ে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। উনিশ বছর বয়সী তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল এবং অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারদের সমন্বয়ে গড়া স্পেনের এই দলটি তাদের নিখুঁত কৌশল ও রক্ষণভাগের দৃঢ়তার কারণে ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। স্পেনের পাসিং ফুটবলের শৈলী, যা টিকি-টাকা নামে পরিচিত, সেটি আধুনিক রূপ পেয়ে এই টুর্নামেন্টে দারুণ সফল হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ষোলো বছর পর আবারও ট্রফি উঁচিয়ে ধরার হাতছানি স্প্যানিশদের সামনে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, স্পেনের এই সুশৃঙ্খল পজিশনাল ফুটবল কৌশল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রবল আবেগের সামনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ এই ম্যাচে মেসির পাশাপাশি স্প্যানিশ রক্ষণভাগ ভাঙতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে স্পেনের মিডফিল্ডাররা চাইবেন পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে লাতিন দলটির আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের বল পাওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে। মাঝমাঠে বল দখলের এই লড়াই মূলত নির্ধারণ করে দেবে কোন দল আক্রমণভাগে বেশি সুবিধা আদায় করতে পারবে। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকেও স্পেনের তরুণ ফরোয়ার্ডদের দ্রুতগতির আক্রমণ সামলাতে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বর্তমান লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন দল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক দর্শকদের বিশাল সমাগম নির্বিঘ্নে সামাল দিতে নিউ ইয়র্ক শহর এবং এর আশেপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দুই দলই যখন তাদের শেষ মুহূর্তের কৌশলগত প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নতুন এক ইতিহাস দেখার জন্য। রোববারের এই ম্যাচ হয়তো স্পেনকে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেবে, নয়তো বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার বর্তমান আধিপত্যকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে। বিগত প্রায় এক মাস ধরে চলা ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের সুন্দরতম সমাপ্তি দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।
