অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেমের কাছে আল-খাদের স্টেডিয়ামে দীর্ঘ বিরতির পর জ্বলে উঠেছে রাতের বাতি। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে তরুণদের উদ্দীপনামূলক গান, পরিবারগুলোর উপস্থিতি এবং সামনের সারিতে শিশুদের দৌড়াদৌড়ির মধ্য দিয়ে প্রায় তিন বছর পর ফিলিস্তিনে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজিত ফুটবল প্রতিযোগিতা। মাঠের ভেতরে আরব অর্থোডক্স বেইত জালা ও ধেইশেহ ইয়ুথ ক্লাবের খেলোয়াড়েরা বাঁশি বাজার সাথে সাথেই বল দখলের লড়াইয়ে মেতে ওঠেন।
মাঠে ফিরেছে দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি ক্লাব।
অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান ও গাজার ধ্বংসযজ্ঞের পর পুরো অঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছিল। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্রাণ হারানো এক হাজার ১৪ জন ক্রীড়াবিদের স্মরণে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের নাম দেওয়া হয়েছে হাজার শহীদের কাপ। পশ্চিম তীর, অবরুদ্ধ গাজা এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরগুলোর দলগুলোকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ফুটবলকে স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এই আসর আয়োজন করেছে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
খেলার বিরতিতে স্টেডিয়ামের পেছনের অংশে হঠাৎ শোরগোল শুরু হলে গ্যালারির দর্শকেরা ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন।
বেইত জালার কুড়ি বছর বয়সী খেলোয়াড় সিজার সারাস জানান, অতীতে মাঠে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের বহু ঘটনা তিনি শুনেছেন। সমর্থকদের মধ্যে সামান্য তর্কাতর্কি থেকে এই শব্দের সৃষ্টি হলেও খেলোয়াড়দের মনে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক অভিযানের ভয় চেপে বসেছিল। আইদা শরণার্থী শিবির থেকে খেলা দেখতে আসা পনেরো বছর বয়সী কিশোরী রিমাস সারহান জানান, পূর্ণ গ্যালারির সামনে এমন আয়োজন তাদের বাইরের দেশের মতো একটি স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি এনে দেয়।
ফুটবল সংস্থার মহাসচিব ফিরাস আবু হিলাল জানান, সর্বত্র সামরিক তল্লাশিচৌকি বসিয়ে, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে এবং স্টেডিয়ামগুলোর ওপর সরাসরি বোমাবর্ষণ চালিয়ে এই খেলাটি থামিয়ে রাখা হয়েছিল। গাজা উপত্যকার শতকরা ৯০ ভাগ স্টেডিয়াম এখন সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশে গেছে, যার ধ্বংসস্তূপের ওপর বর্তমানে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আশ্রয়ের জন্য তাঁবু খাটিয়ে বাস করছে। নিহত ক্রীড়াবিদদের তালিকায় রয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড সুলেমান আল-ওবায়েদ, যিনি ২০২৫ সালে গাজায় খাদ্য সহায়তার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিহত হন, এবং অলিম্পিক দলের কোচ হানি আল-মাসদার।
আবু হিলাল বলেন, আমরা গোটা বিশ্বকে দেখাতে ফিরে এসেছি যে আমরা এমন এক জাতি যাদের টিকে থাকতে হবে।
সামরিক বাধা এড়াতে সংস্থাটি ভৌগোলিক নৈকট্যের ভিত্তিতে কাছাকাছি এলাকার দলগুলোকে নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করেছে যাতে দূরপাল্লার যাতায়াত কম করতে হয়। ফিলিস্তিনের প্রতিটি শহর ও গ্রামীণ প্রবেশমুখে দখলদার বাহিনীর লোহার ফটক রয়েছে, যা যেকোনো সময় বন্ধ করে দিয়ে দলের যাতায়াত আটকে দেওয়া হতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে যে খেলা সাময়িকভাবে পিছিয়ে যেতে পারে কিন্তু টুর্নামেন্ট কোনোভাবেই বাতিল করা হবে না, এবং এটিকে প্রতি বছর নিয়মিত আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন খেলা বন্ধ থাকার কারণে ক্লাবগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং খেলোয়াড়দের বেতন দিতে ব্যর্থ হয়ে তাদের অপেশাদার মর্যাদায় ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ধেইশেহ ক্লাবের খেলোয়াড় মোহাম্মদ এল-জগাইরি অতীতে সাড়ে আট বছর ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং ২০১৫ সালে পায়ে সরাসরি গুলি লেগে হাড় ভেঙে যাওয়ায় দুই বছর মাঠের বাইরে কাটিয়েছিলেন। নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানান যে ক্রীড়াবিদ হিসেবে আত্মসমর্পণ করার কোনো সুযোগ তাদের নেই, বেঁচে থাকার জন্য তাদের আশা ধরে রাখতেই হবে।
গত তিন বছরে ফিলিস্তিন জুড়ে ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে, যাকে ফুটবল কর্তৃপক্ষ একটি পরিকল্পিত ক্রীড়া গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমনকি বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরে উঁচু কংক্রিটের বিচ্ছেদ দেয়ালের ঠিক পাশেই অবস্থিত আওদ স্পোর্টস একাডেমির একমাত্র অনুশীলনের মাঠটির ওপর সামরিক উচ্ছেদ নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ফিফা ও ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার বৈশ্বিক প্রতিবাদের মুখে উচ্ছেদ আদেশটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হলেও হুমকি পুরোপুরি কাটেনি। সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও শিবিরের কিশোরী ফাতিমা লুৎফি নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন করে চলেছেন। মাঠের খেলোয়াড়েরা স্পষ্ট করেছেন যে তারা কেবল কোনো পরিসংখ্যানে আটকে থাকা সাধারণ সংখ্যা নন, নিজেদের স্বপ্নের মধ্য দিয়েই তারা বিশ্বমঞ্চে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন।
