আধুনিক ফুটবল যখন দিন দিন ছক কষা রক্ষণ আর সেট-পিস নির্ভর কৌশলে আটকা পড়ে যাচ্ছে, তখনই প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে দেখা মিলল এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম সেমিফাইনাল লেগটি কেবল পিএসজি এবং বায়ার্ন মিউনিখের লড়াই ছিল না, এটি ছিল মূলত আক্রমণাত্মক ফুটবলের জয়জয়কার।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের ৫-৪ ব্যবধানের এই জয়টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৫৯-৬০ মৌসুমের পর ইউরোপিয়ান কাপের সেমিফাইনালে এটিই সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড, যা দর্শকদের মনে করিয়ে দিল ফুটবল কেন আজও বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলাররা কোনো প্রকার রক্ষণাত্মক কৌশল ছাড়াই একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন। ম্যাচের প্রথমার্ধেই ৫টি গোল দেখে দর্শকরা। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে লিড এনে দিয়েছিলেন হ্যারি কেন। তবে বেশিক্ষণ সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি বায়ার্ন শিবিরে। পিএসজির হয়ে খভিচা কাভারাটস্খেলিয়া এবং জোয়াও নেভেস দ্রুত গোল করে স্কোরলাইন নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন।
এরপর মাইকেল ওলিসের একক নৈপুণ্যে বায়ার্ন সমতায় ফিরলেও প্রথমার্ধের ঠিক আগে বিতর্কিত এক পেনাল্টিতে পিএসজিকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন উসমান দেম্বেলে। আলফোনসো ডেভিসের হ্যান্ডবল থেকে পাওয়া এই গোলটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও খেলার গতির কাছে তা ঢাকা পড়ে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে পিএসজি আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। কাভারাটস্খেলিয়া এবং দেম্বেলের দ্বিতীয় গোলগুলোতে ভর করে ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল বায়ার্ন মিউনিখ হয়তো বড় ব্যবধানে হেরে ছিটকে যাবে টুর্নামেন্ট থেকে।
কিন্তু জার্মান ক্লাবটির লড়াকু মানসিকতা আবারও দৃশ্যমান হয়। দাইওত উপামেকানো এবং ডায়াজ শেষ দিকে দুটি গোল শোধ করলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-৪ এ। এই হারের পরেও বায়ার্ন মিউনিখ দ্বিতীয় লেগের জন্য বড় আশার আলো দেখছে, কারণ আগামী সপ্তাহে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে তাদের নিজেদের মাঠ মিউনিখে।
ম্যাচ শেষে পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, তার কোচিং ক্যারিয়ারের এটিই সেরা ম্যাচ। তিনি বলেন যে মাঠের ফুটবল আজ আধুনিক ফুটবলের এক নতুন বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করেছে। রক্ষণাত্মক হয়ে গোল বাঁচানোর চেয়ে গোল করাটাই যে ফুটবলের মূল আনন্দ, তা এই ম্যাচে প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে বায়ার্ন বস ভিনসেন্ট কম্পানি হারের স্বাদ পেলেও তার দলের আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট। তিনি স্বীকার করেছেন যে উচ্চমানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইন-বিটুইন ডিফেন্ডিং কোনো কাজে আসে না, বরং লড়াইয়ে টিকে থাকাই বড় কথা।
পরিসংখ্যান বলছে, এই মৌসুমে পিএসজি ৪৩টি এবং বায়ার্ন ৪২টি গোল করেছে, যা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে কোনো এক আসরে দুই দলের ৪০-এর বেশি গোল করার প্রথম ঘটনা। এই আক্রমণাত্মক ফুটবলের আবহের বিপরীতে বুধবার অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল, যেখানে মুখোমুখি হবে আর্সেনাল এবং আতলেতিকো মাদ্রিদ।
রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত এই দুই দলের ম্যাচটি প্যারিসের মতো গোল উৎসব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ফুটবল বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ওয়েইন রুনির মতো তারকারা মনে করছেন, রক্ষণভাগের দুর্বলতার চেয়েও এখানে ফরোয়ার্ডদের ব্যক্তিগত দক্ষতাই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। আগামী মে মাসে বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফাইনালের টিকিট পেতে মিউনিখের ফিরতি লেগ এখন ফুটবল বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রে।
