বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

দক্ষিণ কোরিয়ায় স্যামসাং ধর্মঘট স্থগিত: এআই বোনাস নিয়ে রফা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২১, ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

দক্ষিণ কোরিয়ায় স্যামসাং ধর্মঘট স্থগিত: এআই বোনাস নিয়ে রফা

দক্ষিণ কোরিয়ার টেক জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সর্ববৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন শেষ মুহূর্তের সমঝোতায় পৌঁছানোর পর তাদের পরিকল্পিত ধর্মঘট স্থগিত করেছে। বুধবার গভীর রাতে, অর্থাৎ ধর্মঘট শুরুর মাত্র নব্বই মিনিট আগে দেশটির শ্রমমন্ত্রী কিম ইয়ং-হুনের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ এই অস্থায়ী বেতন চুক্তিতে পৌঁছায়। বিশ্বের বৃহত্তম মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারের চিপ উৎপাদন নিয়ে যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আপাতত তা কাটল। প্রায় ৪৮ হাজার শ্রমিকের প্রতিনিধিত্বকারী এই ইউনিয়ন জানিয়েছে, ২১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত তাদের যে ধর্মঘট হওয়ার কথা ছিল, সেটি আপাতত স্থগিত থাকবে এবং ২২ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত শ্রমিকরা নতুন চুক্তির ওপর ভোট দেবেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মেমোরি চিপের বিপুল চাহিদার কারণে অর্জিত মুনাফা কীভাবে বণ্টন করা হবে, মূলত তা নিয়েই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

স্যামসাং তাদের মেমোরি চিপ বিভাগে কর্মরত প্রায় ২৭ হাজার কর্মীকে বিশাল অঙ্কের বোনাস দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, যা অন্যান্য চিপ ও ইলেকট্রনিক্স নির্মাতাদের তুলনায় অন্তত ছয় গুণ বেশি। কিন্তু ইউনিয়নের দাবি ছিল, টেসলা এবং এনভিডিয়ার মতো কোম্পানিগুলোর জন্য যারা তুলনামূলক কম উন্নত চিপ তৈরি করেন, সেই ২৩ হাজার কর্মীকেও যেন বঞ্চিত করা না হয়। শ্রমিকদের এই অসন্তোষের কারণে চিপ উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এটি বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত।

বিক্রির দিক থেকে স্যামসাং বিশ্বের বৃহত্তম মেমোরি চিপ নির্মাতা এবং এআই ডেটা সেন্টার, স্মার্টফোন ও ল্যাপটপে ব্যবহৃত চিপের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী।

দক্ষিণ কোরিয়ার মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই আসে স্যামসাং গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। কোম্পানিটির জন্য এই দ্বন্দ্ব এমন এক সংবেদনশীল সময়ে সামনে এসেছে, যখন এআই-চালিত চিপের চাহিদা মেটাতে গিয়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্স এবং মাইক্রনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এআই চিপের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গত মে মাসে শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

গত বছর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স তাদের কর্মীদের বোনাসের সর্বোচ্চ সীমা ১০ বছরের জন্য বাতিল করে দিয়েছিল। এর ফলে তাদের কর্মীরা স্যামসাং কর্মীদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বোনাস পেয়েছিলেন, যার কারণে অনেক দক্ষ কর্মী কাজ ছেড়ে এসকে হাইনিক্সে যোগ দেন। রয়টার্সের দেখা মজুরি আলোচনার নথিপত্র অনুযায়ী, এরপর স্যামসাং তাদের মেমোরি চিপ কর্মীদের বার্ষিক বেতনের ৬০৭ শতাংশ বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, যা এসকে হাইনিক্সের চেয়েও বেশি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে ওই নথিতে দেখা যায়, অন্যান্য বিভাগের কর্মীরা মাত্র ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বোনাস পেতেন।

ইউনিয়ন চেয়েছিল স্যামসাং যেন বার্ষিক বেতনের ৫০ শতাংশ বোনাসের সীমা পুরোপুরি বাতিল করে দেয় এবং বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য আলাদা করে রাখে। স্যামসাংয়ের শীর্ষ কর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে ধর্মঘট হলে তা বিক্রি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অস্থায়ী চুক্তির পর এক বিবৃতিতে স্যামসাং জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য তারা আরও পরিপক্ব ও গঠনমূলক শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

এই ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম আট শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, সেইসঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকও আট শতাংশের বেশি লাফিয়েছে।

জেপি মরগানের মতে, ধর্মঘট চললে স্যামসাংয়ের পরিচালন মুনাফায় প্রায় এক হাজার ৪০৮ কোটি থেকে দুই হাজার ৭৯ কোটি ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারত। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আদালত স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সকে একটি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এই ধর্মঘটের প্রভাব সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আদালত জানিয়েছিল, নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং পণ্যের মান বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলকে স্বাভাবিক মাত্রায় কাজে বহাল রাখতে হবে।

ইউনিয়ন বা এর নেতারা যেন কোম্পানির স্থাপনা দখল করতে না পারেন বা কর্মীদের কাজে বাধা দিতে না পারেন, আদেশে সেটিও উল্লেখ করা হয়েছিল।

নির্দেশ অমান্য করলে ইউনিয়নকে প্রতিদিন ৭৪ হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হতো। কোরিয়ার আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে ব্যাঘাত ঘটলে তা কেবল একটি কোম্পানি নয়, বরং তার চেয়েও অনেক গভীরে প্রভাব ফেলে। এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে প্রতিযোগী বাজারগুলো এর সুবিধা নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

banner
Link copied!