"মহাকাশচারী প্রয়োজন, কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার দরকার নেই"—১৯৮৯ সালের জুনের এক সন্ধ্যায় জ্যামে আটকে থাকা অবস্থায় গাড়ির রেডিওতে এই সাধারণ বিজ্ঞাপনটি শুনেছিলেন ২৭ বছর বয়সী খাদ্য বিজ্ঞানী হেলেন শারম্যান। স্লো-র মার্স চকোলেট কারখানায় নিজের কাজ শেষ করে তখন বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। সামান্য কয়েক সেকেন্ডের সেই রেডিও বিজ্ঞাপনটিই যে তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
এই সাধারণ ঘটনার হাত ধরেই ৩৫ বছর আগে মহাকাশে প্রথম ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন হেলেন শারম্যান।
তৎকালীন শীতল যুদ্ধের আবহে যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার এক যৌথ বাণিজ্যিক উদ্যোগ `প্রজেক্ট জুনো`-র অধীনে এই মহাকাশ অভিযানের আয়োজন করা হয়েছিল। বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল একজন ব্রিটিশ নাগরিককে রাশিয়ান মহাকাশযান মির-এ পাঠানো। প্রায় ১৩ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে কঠোর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত হেলেন শারম্যানকে বেছে নেওয়া হয়।
হেলেন নিজেই ১৯৯১ সালে বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তিনি কখনই বিশ্বাস করতে পারেননি যে তিনিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হবেন।
এই ঐতিহাসিক যাত্রার জন্য হেলেনকে লন্ডনের শহরতলি ছেড়ে পাড়ি দিতে হয়েছিল রাশিয়ার মস্কোর অদূরে অবস্থিত এক গোপন সামরিক ঘাঁটি `স্টার সিটি`-তে। তৎকালীন সোভিয়েত আমলে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি মানচিত্রেও অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে মিখাইল গর্বাচেভের উদারীকরণ নীতির কারণে শেষ সময়ে সেখানে অল্প কয়েকজন বিদেশিকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ১৮ মাস জিরো-গ্র্যাভিটি বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণের অত্যন্ত কঠিন ও নিবিড় শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ নেন হেলেন।
১৯৯১ সালের ১৮ মে সোভিয়েত ইউনিয়নের সোয়ুজ টিএম-১২ স্পেস ক্যাপসুলে চড়ে মহাকাশে পাড়ি জমান হেলেন শারম্যান।
কাজাখস্তানের বৈকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপণের আগে রাশিয়ান মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিনের তৈরি করা একটি অদ্ভুত ঐতিহ্যও তাঁকে অনুসরণ করতে হয়েছিল। মহাকাশে কাটানো আট দিনে তিনি রাশিয়ান কসমোনট আনাতোলি আরতেবারতস্কি এবং সের্গেই ক্রিকালেভের সাথে গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ হন। হেলেন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, মহাকাশের এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন এবং চিন্তাভাবনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
মহাকাশে প্রথম মানুষের গৌরব অর্জনকারী আলেক্সি লিওনভও এই মিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং হেলেনকে একটি বিশেষ নৈশভোজের পোশাক উপহার দিয়েছিলেন।
মির মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর প্রথম রাতে সব ক্রু একসঙ্গে বসে সেই ঐতিহ্যবাহী রাতের খাবার খেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত নিজের স্মৃতিকথায় হেলেন উল্লেখ করেন, স্টার সিটির সেই দিনগুলো এবং মহাকাশের দিনগুলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী সময় ছিল। বর্তমানে তাঁর ব্যবহৃত সেই মূল স্পেস স্যুটটি লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামে সাধারণ দর্শকদের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
