সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিদ্বেষ ও কটূক্তির শিকার হওয়া অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসের ডিজিটাল বিপণনকর্মী টাইলার ব্রিকলি ২০২৩ সালের শুরুতে টিকটকে `কাইন্ডনেস মব` নামের একটি চ্যানেল চালু করেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার — যেখানেই কাউকে লক্ষ্য করে তীব্র বিদ্রূপ করা হচ্ছে, সেখানেই হাজার হাজার ইতিবাচক মন্তব্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেওয়া।
এখন পর্যন্ত সাড়ে তিনশর বেশি মানুষকে এই সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের বাসিন্দা লরা টিগেলিরো মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নামের একটি স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত। এই রোগের কারণে তার এক চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা হেলে থাকে। টিকটকে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রণালি ভাগ করে নেওয়ার সময় তাকে প্রতিনিয়ত নিষ্ঠুর মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হতো। হঠাৎ একদিন সকালে তার একটি ভিডিওতে ১৫ হাজারের বেশি সহানুভূতিশীল মন্তব্য জমা হয়। ব্রিকলির অনুসারীরা এসে কটূক্তিকারীদের ভাষাকে ভালোবাসার আবহে ঢেকে দেন। পরে অনুসারী বেড়ে যাওয়ায় লরা প্ল্যাটফর্মটি থেকে অর্থ আয় শুরু করেন এবং নিজের পরিবারের জন্য একটি গাড়ি কিনতে সক্ষম হন।
অনলাইনে সাধারণত ট্রল বা কটূক্তিকারীরা যেভাবে দলবদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালায়, এই উদ্যোগেও ঠিক একই কৌশল উল্টোভাবে প্রয়োগ করা হয়। ব্রিকলির চ্যানেলে অনুসারীর সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ লাখ। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা রেনি পেনিক যখন তার অসুস্থ স্বামীর হাসপাতালের শয্যার পাশে ছিলেন, তখন এই ইতিবাচক মন্তব্যের ঢেউ তাকে কঠিন সময়ে সাহস জুগিয়েছিল। আপস্টেট নিউ ইয়র্কের সঙ্গীতশিল্পী নকটার্ন একইভাবে বহু অনুসারী পেয়ে এখন কনসার্ট সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উদ্যোগটির প্রতিষ্ঠাতা জানান, তিনি মূল ব্যক্তিদের মনোযোগ নিজের দিকে নিতে চান না, বরং তাদের নিজস্ব পরিচয় উজ্জ্বল করতেই কাজ করেন।
অনেক ক্ষেত্রে একযোগে ভালো মন্তব্য আসার পর আক্রমণকারীরা থেমে যায়।
বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করছেন মানুষের আচরণগত বিস্তারের অংশ হিসেবে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক নিকোলাস ক্রিস্টাকিস উল্লেখ করেন, মানবসমাজে ভালো ও মন্দ দুটি গুণই ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম প্রায়ই মানুষের দ্বন্দ্ব ও নেতিবাচক অনুভূতি উসকে দিয়ে তাদের পর্দায় ধরে রাখে। কিন্তু যখন কোনো ক্ষতিকর আচরণের বিপরীতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তখন বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিরাও নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
তবে এই বিপুল পরিমাণ মানবিক কাজের চাপ সামলানো সহজ নয়। প্রতিদিন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ২০ থেকে ১০০ জন ভুক্তভোগীর নাম সুপারিশ করা হয়, কিন্তু সক্ষমতার অভাবে দিনে মাত্র একজনকে বেছে নেওয়া সম্ভব হয়। ব্রিকলি জানান, প্রতি মাসে এই চ্যানেল থেকে আয় হয় নগণ্য — গত আগস্টে টিকটক থেকে তার আয় ছিল মাত্র ৩৯ ডলার। ক্রমাগত মানুষের অসহায়ত্বের গল্প শুনতে শুনতে তিনি চরম মানসিক অবসাদে পড়েন এবং কয়েক মাস কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। পরে কিছু স্বেচ্ছাসেবকের সহায়তায় কাজের বণ্টন করে আবার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
গত শরৎকালে ব্রিকলির পিঠের অস্ত্রোপচারের পর তার স্ত্রী গোপনে অনুসারীদের অনুরোধ জানালে তার নিজের অ্যাকাউন্টেও হাজারটির বেশি ভালোবাসার বার্তা জমা হয়। নিজের উদ্যোগের প্রভাব বাস্তব জীবনে দেখার পর ব্রিকলি জানান, সামাজিক মাধ্যমকে সবার জন্য নিরাপদ ও সহনশীল করতে এই প্রচেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন।
