বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড সেবার পরিধি যত বাড়ছে, আধুনিক কম্পিউটার অবকাঠামোর জ্বালানি চাহিদাও তত তীব্র হচ্ছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোয় ব্যবহৃত সার্ভার ও নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে এবার প্রচলিত তামার তারের বদলে আলো ব্যবহারের পথে হাঁটছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাত। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনের বদলে আলোর কণা বা ফোটন দিয়ে ডেটা স্থানান্তর শুরু হলে শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপর চাপ অর্ধেকের বেশি কমে আসতে পারে।
তামার একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।
তথ্যভাণ্ডার পরিচালনাকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল রিয়েলিটির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ক্রিস শার্প জানান, তামার মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে এমন নয়, তবে এর ওপর নির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টারে প্রায় ৪০০ টন পর্যন্ত তামা ব্যবহার করা হয়। এর বেশিরভাগ অংশ বিদ্যুৎ সংযোগ ও সার্বিক অবকাঠামোয় গেলেও প্রায় ৭০ টন তামা সরাসরি সার্ভারের ভেতর এবং আরও প্রায় ২০ টন তামা সার্ভারগুলোকে যুক্ত করা অন্তর্জাল তারে ব্যয় হয়। প্রসেসর ও গ্রাফিক্স কার্ডের মধ্যকার এই জটিল প্যাঁচানো তারগুলোই মূলত কাজের সামগ্রিক গতি ধীর করে দিচ্ছে বলে মনে করেন প্রযুক্তিবিদেরা।
ইলেকট্রনের পথ আটকে দিচ্ছে উত্তাপ।
বিদ্যুৎপ্রবাহে তামার তার কার্যকর হলেও দীর্ঘ সময় ধরে ইলেকট্রন চলাচলে বিপুল তাপ উৎপন্ন হয়। অপটিক্যাল ফাইবার এতদিন শুধু এক শহর থেকে অন্য শহরে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ডেটা পরিবহনে বাইরে ব্যবহৃত হতো। এখন এই তন্তু সরাসরি প্রসেসর চিপের ওপর বসিয়ে ফোটোনিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ তথ্য আদান-প্রদানের পরীক্ষা চলছে। আলো যেহেতু বিদ্যুতের মতো পরিবেশ উত্তপ্ত করে না, তাই সার্ভার কক্ষ ঠান্ডা রাখতে বিদ্যুৎ খরচের এক বিশাল অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
একই সংযোগ লাইনে একাধিক ডেটা প্রবাহ পাঠানোর সুবিধার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সিলিকন ফোটোনিক্স নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কর্নারস্টোন ল্যাবসের উপ-পরিচালক ক্যালাম লিটলজন্স জানান, আলো দিয়ে তথ্য পাঠালে সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এদিকে আয়ারল্যান্ডের টিন্ডাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক পিটার ও`ব্রায়েন নিশ্চিত করেছেন যে ফোটোনিক্স প্রযুক্তি গবেষণাগারের ধাপ পেরিয়ে এখন ব্যাপক শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই রূপান্তরের পেছনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Nvidia সক্রিয় সমর্থন জোগাচ্ছে।
তবে এই পুরো প্রযুক্তিগত বদল রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। ইলেকট্রনিক্স চিপের উৎপাদন ও পরীক্ষার খরচ বহু বছরের পরিশ্রমে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও ফোটোনিক্সের সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল এখনও পুরোপুরি সুসংগঠিত নয়। বিশেষ করে শেষ ধাপের যন্ত্রাংশ একত্রীকরণের কাজ মূলত তাইওয়ানের কয়েকটি বিশেষায়িত কারখানায় সীমাবদ্ধ।
চিপ বিশ্লেষকদের সামনে আরেকটি ব্যবহারিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। হিউলেট প্যাকার্ড ল্যাবসের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু হুইলারের মতে, অপটিক্যাল উপাদানগুলো নিজস্বভাবে তাপ তৈরি না করলেও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য সরঞ্জামের তাপে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। ফলে সামগ্রিক তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা না গেলে অপটিক্যাল নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তদুপরি কাচের তন্তু খুব বেশি শক্তভাবে বাঁকানো যায় না বলে স্থাপনা ও মাঠ পর্যায়ের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের জন্য নতুন প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ছে।
প্রযুক্তিটির পূর্ণ সুফল পেতে হলে শুধু তথ্য পরিবহন নয়, প্রক্রিয়াকরণের ধাপেও আলোর ভূমিকা থাকতে হবে বলে প্রস্তাব দিয়েছে রেজোলাইট ডট এআই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওফার শাপিরো জানান, আলোকে ইলেকট্রনে এবং ইলেকট্রনকে আবার আলোতে বারবার রূপান্তর করা এক ধরণের অপচয়। সরাসরি কম্পিউটার চিপের ভেতরেই অপটিক্যাল সংযোগ থাকলে এই অপচয় সম্পূর্ণ বন্ধ হবে।
উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে একটি বিকল্প পথও দেখা যাচ্ছে। ফোটোনিক্সের কিছু যন্ত্রাংশ সাধারণ সিলিকন প্রসেসরের চেয়ে আকারে সামান্য বড় হওয়ায় পুরোনো কারখানার মেশিনারি এতে পুনর্ব্যবহার করা যাচ্ছে। যেমন, দুই দশক আগে বাজারে আসা বিখ্যাত Pentium 4 চিপ তৈরির পুরোনো কারখানা সরঞ্জাম দিয়েই কর্নারস্টোন ল্যাবস তাদের ফোটোনিক্সের প্রাথমিক গবেষণা ও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের ধারণা, সিলিকন চিপ তৈরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত এই নতুন আলোর প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে সাশ্রয়ী করে তুলবে।
