রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

স্পটিফাই কেন এআই সংগীত ফিল্টার করার বাটন দিচ্ছে না?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

স্পটিফাই কেন এআই সংগীত ফিল্টার করার বাটন দিচ্ছে না?

মিউজিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট স্পটিফাইয়ের প্লেলিস্টে এখন মানুষের তৈরি সুরের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি গান। অনেক ব্যবহারকারী এখন আর পার্থক্য করতে পারছেন না কোনটি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষের সৃষ্টি আর কোনটি স্রেফ কম্পিউটারের কোডিং। জার্মানির লাইপজিগ শহরের সফটওয়্যার ডেভেলপার সেড্রিক সিক্সটাস এমনই একজন ব্যবহারকারী, যিনি নিজের প্লেলিস্টে এআই গানের আধিপত্য দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি নিজেই একটি টুল তৈরি করেন যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পটিফাই থেকে এআই গান শনাক্ত করে ব্লক করে দেয়। সিক্সটাস মনে করেন, ব্যবহারকারীদের এই অধিকার থাকা উচিত যে তারা কোনো রোবটের তৈরি গান শুনবেন নাকি মানুষের। তবে স্পটিফাই কর্তৃপক্ষ এখনো এমন কোনো বাটন বা ফিল্টার যুক্ত করেনি যা দিয়ে সাধারণ ব্যবহারকারীরা এআই গানগুলোকে সরিয়ে রাখতে পারেন।

বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিক্সটাস যে এআই ব্লকারটি তৈরি করেছেন তা ইতিমধ্যেই শত শত মানুষ ডাউনলোড করেছেন। এটি প্রায় ৪ হাজার ৭০০ জনের বেশি সন্দেহভাজন এআই শিল্পীর তালিকা ব্যবহার করে গানগুলোকে ফিল্টার করে। যদিও সিক্সটাস সতর্ক করেছেন যে তার এই সফটওয়্যার ব্যবহার করা স্পটিফাইয়ের নীতিমালার লঙ্ঘন হতে পারে, তবুও ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছেই। 

অনেক শ্রোতা স্রেফ নৈতিক কারণে কোনো বটের তৈরি গান শুনতে চান না। তারা মনে করেন, সংগীত একটি মানবিক অনুভূতি এবং এখানে কৃত্রিম উপাদানের অনুপ্রবেশ শিল্পের মান কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে স্পটিফাই বিষয়টিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। তারা গত এপ্রিলে একটি পরীক্ষামূলক ফিচার চালু করেছিল যেখানে গানের ক্রেডিট অংশে এআই ব্যবহারের তথ্য দেখানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এবং শিল্পীদের সততার ওপর নির্ভরশীল।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষক রবার্ট প্রে মনে করেন, স্পটিফাই একটি অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে তারা প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে চায়, অন্যদিকে সাধারণ শিল্পী ও শ্রোতাদের আস্থা হারানোর ভয়ও আছে। 

তিনি জানান, স্পটিফাই মূলত মিউজিক তৈরিতে কোনো ধরনের বিচারক হতে চায় না। অর্থাৎ গানটি কীভাবে তৈরি হলো তার চেয়ে গানটি জনপ্রিয় কি না, সেদিকেই তাদের নজর বেশি। কিন্তু যখন এআই গানগুলো সাধারণ শিল্পীদের আয়ের ভাগ নিতে শুরু করে, তখন বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। 

বর্তমানে সুনো বা উডিওর মতো উন্নত এআই টুলগুলো দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লিরিক, কণ্ঠ এবং সুরসহ একটি পূর্ণাঙ্গ গান তৈরি করা সম্ভব। ডিজার এবং ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ সাধারণ শ্রোতা এআই এবং মানুষের তৈরি গানের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হন।

বিশ্বের বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন হাজার হাজার এআই গান আপলোড করা হচ্ছে। স্পটিফাই, ইউটিউব মিউজিক বা অ্যামাজন মিউজিকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো এআই গান শনাক্তের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক লেবেল বা স্বচ্ছ ফিল্টার ব্যবহার করছে না। 

স্পটিফাইয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে তারা বর্তমানে স্প্যাম এবং জালিয়াতি রোখার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, কোনো গান কীভাবে তৈরি হলো তার ওপর ভিত্তি করে ফিল্টার করতে চান না। তবে তাদের ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী ডিজার ইতিমধ্যেই এই পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ডিজার গত বছর থেকেই এআই দিয়ে তৈরি অ্যালবামগুলো শনাক্ত করে সেগুলোতে ট্যাগ বসানো শুরু করেছে। 

এমনকি তারা এআই গানগুলোকে তাদের অ্যালগরিদম বা মানুষের তৈরি প্লেলিস্ট থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। ডিজারের দাবি, তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি রয়েছে যা শব্দের গাণিতিক প্যাটার্ন দেখে বুঝতে পারে এটি কম্পিউটারের সৃষ্টি কি না।

অ্যাপল মিউজিকও সম্প্রতি জানিয়েছে যে তারা ধীরে ধীরে ট্রান্সপারেন্সি ট্যাগ বা স্বচ্ছতা সূচক চালু করবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ অনেক শিল্পীই সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে এআই ব্যবহারের বিষয়টি লুকাতে পারেন। সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির এআই বিশেষজ্ঞ মায়া অ্যাকারম্যানের মতে, সংগীতের ক্ষেত্রে এআই একটি বিশাল পরিসর জুড়ে আছে। 

কেউ হয়তো স্রেফ লিরিক লিখতে এআই ব্যবহার করছেন, আবার কেউ পুরো গানটিই বটের মাধ্যমে বানাচ্ছেন। ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছালে একটি গানে এআই লেবেল লাগানো উচিত, তা নিয়ে এখনো কোনো আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো সরাসরি কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকছে, যদিও ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে দাবি দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।

banner
Link copied!