রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মিলছে শুক্রাণু: বাবা হতে পারবেন হাজারো পুরুষ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১, ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মিলছে শুক্রাণু: বাবা হতে পারবেন হাজারো পুরুষ

যাদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নেই বলে চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, সেইসব পুরুষদের জন্য এখন নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা একজন পুরুষের শরীরে থাকা অতি নগণ্য সংখ্যক বা ‍‍`লুকানো‍‍` শুক্রাণুও খুঁজে বের করতে সক্ষম। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‍‍`স্টার সিস্টেম‍‍` বা স্পার্ম ট্র্যাক অ্যান্ড রিকভারি। এই প্রযুক্তির কল্যাণে ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক দম্পতি বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন, যাদের আগে বলা হয়েছিল যে তাদের কোনো জৈবিক সন্তান হওয়া সম্ভব নয়।

এই প্রযুক্তির সাফল্যের একটি বাস্তব উদাহরণ হলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের পেনেলোপ ও স্যামুয়েল। তারা দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় স্যামুয়েল ‍‍`ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম‍‍` নামক একটি বিরল জেনেটিক সমস্যায় ভুগছেন। এই সমস্যায় আক্রান্ত পুরুষদের শুক্রাণুর পরিমাণ এতই কম থাকে যে সাধারণ মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় অ্যাজোস্পার্মিয়া। বিশ্বের প্রায় ১ শতাংশ পুরুষ এই সমস্যায় ভোগেন। স্যামুয়েলকে বলা হয়েছিল তার বাবা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ। কিন্তু স্টার সিস্টেমের সহায়তায় গবেষকরা তার নমুনা থেকে একটি সুস্থ শুক্রাণু খুঁজে বের করতে সক্ষম হন এবং সেই একটি ভ্রূণ থেকেই পেনেলোপ গর্ভবতী হন।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ফার্টিলিটি সেন্টারের পরিচালক ডক্টর জেভ উইলিয়ামস এই প্রযুক্তির পেছনে মূল কারিগর। তিনি জানান, ২০২০ সালে মহাকাশ বিজ্ঞানে নতুন নক্ষত্র খুঁজে পেতে এআই-এর ব্যবহার দেখে তিনি এই পরিকল্পনাটি করেন। আকাশে যেমন কোটি কোটি বস্তুর ভিড়ে নতুন তারা খুঁজে পাওয়া কঠিন, তেমনি অ্যাজোস্পার্মিয়া আক্রান্ত রোগীদের নমুনাতেও হাজার হাজার কোষ ও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে একটি মাত্র শুক্রাণু খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। একজন দক্ষ ল্যাব টেকনিশিয়ানের পক্ষে যা খুঁজে বের করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, এআই তা কয়েক মিলিসেকেন্ডেই করে ফেলছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, স্টার সিস্টেম একজন মানুষের তুলনায় প্রায় ৪০ গুণ বেশি কার্যকরভাবে শুক্রাণু শনাক্ত করতে পারে। এই পদ্ধতিতে একটি চুলের মতো পাতলা চ্যানেলের ভেতর দিয়ে নমুনা প্রবাহিত করা হয় এবং এআই প্রতি সেকেন্ডে ৩০০টি ছবি স্ক্যান করে। যদি সেখানে একটি মাত্র শুক্রাণুও থাকে, তবে প্রযুক্তিটি তৎক্ষণাৎ তা চিহ্নিত করে আলাদা করে ফেলে। এতে শুক্রাণুর কোনো ক্ষতি হয় না, যা পরবর্তী আইভিএফ প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত থাকে।

গত বছরের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথম শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে। বর্তমানে কলম্বিয়া ফার্টিলিটি সেন্টারে কয়েকশ দম্পতি এই সেবা পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। ডক্টর উইলিয়ামস জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৭৫ জন রোগীর ওপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং যাদের আগে ‍‍`অক্ষম‍‍` বলা হয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে শুক্রাণু খুঁজে পাওয়া গেছে। এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি বিশাল মাইলফলক।

এই নতুন উদ্ভাবন প্রমাণ করছে যে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতম দুঃখগুলোকেও আনন্দে রূপান্তর করতে পারে। বন্ধ্যাত্ব এখন আর কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও বটে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ পুরুষকে তাদের নিজেদের জৈবিক সন্তান পাওয়ার একটি প্রকৃত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা আশা করছেন, অদূর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হবে এবং আরও নিখুঁতভাবে কাজ করবে।

banner
Link copied!