নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কিংবা কোনো পণ্যের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে `জনমত জরিপ` বা অপিনিয়ন পোলিং সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে প্রথাগত পদ্ধতিতে মানুষের সাড়া দেওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এই শিল্পে প্রবেশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ফরাসি প্রতিষ্ঠান `নারাতিস` (Naratis) সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ এখন দাবি করছে যে, এআই এজেন্ট ব্যবহার করে মানুষের মনের গভীরতম মতামত এখন আগের চেয়ে ১০ গুণ দ্রুত এবং অনেক কম খরচে সংগ্রহ করা সম্ভব।
প্যারিস ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নারাতিসের প্রতিষ্ঠাতা ২৮ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার পিয়েরে ফন্টেইন জানান, তারা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন যা সরাসরি মানুষের সঙ্গে ফোনে কথোপকথন চালাতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় তিনটি ভিন্ন এআই এজেন্ট কাজ করে। একজন উত্তরদাতার কথার গভীরতা যাচাই করে, দ্বিতীয়জন তিনি প্রাসঙ্গিক উত্তর দিচ্ছেন কি না তা দেখে এবং তৃতীয়জন নিশ্চিত করে যে উত্তরদাতা কোনো রোবট নয় বরং একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। নারাতিসের দাবি অনুযায়ী, তাদের এই পদ্ধতি প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভুল এবং মানুষের দ্বারা পরিচালিত জরিপের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
প্রথাগত গুণগত গবেষণায় (Qualitative Research) সাধারণত অল্প কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু এআই কয়েক হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার একই সাথে নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের `আউটসেট` (Outset) এবং `লিসেন ল্যাবস` (Listen Labs)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। এমনকি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে `রয়্যাল সোসাইটি ওপেন স্যান্স`-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের ডেটা বিশ্লেষণে এআই পোলিংয়ের ফলাফল ফাইভ-থার্টি-এইট (FiveThirtyEight)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় পোলিং এগ্রিগেটরদের মতোই নির্ভুল ছিল।
তবে এই প্রযুক্তির কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। জরিপ শিল্পে এখন `ডিজিটাল টুইন` বা মানুষের ভার্চুয়াল সংস্করণ এবং `সিন্থেটিক পিপল` ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এটি মূলত কৃত্রিমভাবে তৈরি এমন কিছু প্রোফাইল যারা সত্যিকারের মানুষের মতো আচরণ করে। ইপসস (Ipsos)-এর মতো অনেক নামী প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক জরিপে এখনো এআই-এর এই সম্পূর্ণ কৃত্রিম সংস্করণ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করছে। সমালোচকদের মতে, ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট বা ট্রাম্পের জয়ের পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হওয়া পোলিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য এআই একটি বড় সমাধান হতে পারলেও, মানুষের আবেগ এবং পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব সঠিকভাবে ধরা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই মূলত সেই অভাব পূরণ করবে যেখানে মানুষ সরাসরি তথ্য দিতে অনাগ্রহী। বর্তমানে জরিপে মানুষের অংশগ্রহণের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসংগঠিত তথ্য থেকে সঠিক পূর্বাভাস বের করা অনেক সহজ হবে। তবে জনমতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এআই-এর অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
