যুক্তরাজ্যের জনমতকে প্রভাবিত করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলমান অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার নেপথ্যে এক বিশাল বিদেশি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। প্যানোরামা ও টপ কমেন্ট পডকাস্টের যৌথ এক তদন্তে উঠে এসেছে যে, ব্রিটেনের পতনের কাল্পনিক ছবি ও ভিডিও প্রচারকারী ডজনখানেক প্রভাবশালী অ্যাকাউন্ট আসলে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম এবং মালদ্বীপের মতো দেশগুলো থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এসব অ্যাকাউন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এমন সব কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে যা ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভেদ সৃষ্টি করে।
তদন্তকারীরা "গ্রেট ব্রিটিশ পিপল" নামক একটি ফেসবুক পেজ চিহ্নিত করেছেন যা নিজেকে ইয়র্কশায়ারের একটি স্থানীয় পেজ হিসেবে দাবি করে। এই পেজের একটি সাম্প্রতিক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ ব্যক্তি তার পেনশন নিয়ে কাঁদছেন। ভিডিওটি ইতিমধ্যে ১৩ লাখের বেশি মানুষ দেখেছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, এই পেজটি আসলে শ্রীলঙ্কা থেকে একজন ব্যক্তি পরিচালনা করছেন যার সাথে যুক্তরাজ্যের কোনো সরাসরি সংযোগ নেই। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি সুসংগঠিত প্রভাব বিস্তারের নেটওয়ার্কের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব ভিডিওতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভেতরে শরিয়াহ আইন চালু হওয়ার মতো ভুয়া দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, হাউজ অফ কমন্স ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাকে থাকা পুরুষদের দিয়ে পূর্ণ। অন্য কিছু ভিডিওতে হিজাব পরা নারীদের ভুয়া ইন্টারভিউ দেখানো হচ্ছে যেখানে তারা দাবি করছেন যে যুক্তরাজ্যকে আরও ইসলামিক হওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের বানোয়াট কনটেন্ট মূলত ব্রিটিশদের মধ্যে ইসলামবিদ্বেষ ও অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, কিছু মানুষ কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য এআই কনটেন্ট তৈরি করলেও এর পেছনে রাশিয়া ও ইরানের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মদত থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সাদিক খানের মতে, লন্ডনের পতনের এই ভুয়া ছবিগুলো বিদেশে শহরের সুনাম নষ্ট করছে। ফেসবুকের ট্রান্সপারেন্সি টুল এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জানা গেছে, এই অ্যাকাউন্টগুলোর উৎসস্থল কেবল এশিয়ায় নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে আছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্যান্ডার ভ্যান ডার লিন্ডেন এই বিষয়টিকে প্রভাব বিস্তারের অভিযানের একটি "নতুন বিবর্তন" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বিদেশের ভুয়া অ্যাকাউন্টধারীদের পক্ষে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাজ্যের নামে আগে থেকেই তৈরি করা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো এখন খুব সস্তায় কেনা যায়। মানুষ সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে পারে না এবং তারা যত বেশি এই ধরনের কনটেন্ট দেখে, তত বেশি মূলধারার সঠিক তথ্যের প্রতি তাদের অবিশ্বাস বাড়তে থাকে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, অনেক পেজ আগে "মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন" বা যুক্তরাষ্ট্রের জীবন নিয়ে কনটেন্ট প্রচার করত। কিন্তু বেশি এনগেজমেন্ট বা ভিউ পাওয়ার আশায় তারা এখন এআই ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের অভিবাসনবিরোধী প্রচারণায় সুইচ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে একই ক্রিয়েটররা পরস্পরবিরোধী কনটেন্টও প্রচার করছে। একদিকে তারা ব্রিটেনের পতন দেখাচ্ছে, আবার অন্যদিকে ইসলামিক দেশগুলোকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রচারণা প্রমাণ করে যে তাদের মূল উদ্দেশ্য জনমত গঠন নয় বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং আর্থিক লাভ।
