রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

সিল্কের শহর তুরস্কের বুর্সা: অটোমান ঐতিহ্যের রেশমি উত্তরাধিকার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

সিল্কের শহর তুরস্কের বুর্সা: অটোমান ঐতিহ্যের রেশমি উত্তরাধিকার

তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক শান্ত অথচ সমৃদ্ধ শহর বুর্সা। অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই শহরটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রেশম উৎপাদন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। আল জাজিরার বিশেষ সিরিজ ‍‍`ট্রেসেস অফ সিল্ক‍‍`-এর দ্বিতীয় পর্বে বুর্সার এই রেশমি ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বুর্সার নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের রেশম বুননশৈলী এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে।

বুর্সার ইতিহাসের সাথে রেশমের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সিল্ক রোডের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল হিসেবে এই শহরটি একসময় চীন থেকে আসা কাঁচা রেশমের প্রধান গন্তব্য ছিল। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন ও অটোমান শাসনামলে বুর্সা নিজেই রেশম চাষ ও বুননের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানকার জলবায়ু তুঁত চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় খুব দ্রুতই শহরটি রেশম গুটি উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বুর্সার রেশমি বস্ত্র একসময় ইউরোপের রাজপরিবার এবং অটোমান সুলতানদের পোশাকের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

শহরটির স্থাপত্যশৈলী আজও সেই সোনালী যুগের সাক্ষ্য দেয়। বুর্সার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‍‍`কোজা হান‍‍` বা রেশম বাজারটি এর উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৪৯১ সালে সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ কর্তৃক নির্মিত এই বিশাল স্থাপনাটি আজও রেশম বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। দোতলা বিশিষ্ট এই হানের বারান্দায় বসলে আজও যেন সেই প্রাচীন বণিকদের হাকডাক কানে আসে। আল জাজিরার তথ্যমতে, বর্তমান সময়ের তরুণ উদ্যোক্তা ও কারিগররা এই ঐতিহাসিক স্থানে বসে প্রাচীন বুনন পদ্ধতিকে আধুনিক নকশার সাথে সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন। তারা কেবল কাপড় তৈরি করছেন না, বরং একটি হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসকে নতুন রূপ দিচ্ছেন।

বুর্সার রেশম শিল্পের একটি অনন্য দিক হলো এর পারিবারিক ঐতিহ্য। অনেক কারিগর পরিবার রয়েছে যারা বংশানুক্রমে এই পেশার সাথে যুক্ত। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত বুর্সার এই শিল্পটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং তুর্কি পরিচয়ের একটি অংশ। রেশম গুটি থেকে সুতা আহরণ এবং তা থেকে সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত বস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও ধৈর্যের কাজ। নতুন প্রজন্মের কারিগররা এই জটিল শিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সমবায় গড়ে তুলেছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বুর্সা ছিল ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্যের সেতুবন্ধন। রেশম পথের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটেছিল, তার গভীর প্রভাব পড়েছে বুর্সার রন্ধনপ্রণালী, ধর্মতত্ত্ব এবং জীবনযাত্রায়। আল জাজিরার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বুর্সার রেশম কেবল একটি পণ্য ছিল না, এটি ছিল কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যম। সুলতানরা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বুর্সার তৈরি রেশমি শাল ও বস্ত্র উপহার দিয়ে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করতেন।

বর্তমানে বুর্সা তুরস্কের একটি বড় শিল্পনগরী হলেও এর রেশম আভিজাত্য কমেনি। শহরের প্রতিটি অলিগলিতে রেশমের তৈরি সুতিবস্ত্র, স্কার্ফ এবং শাড়ির দোকান পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তবে এই শিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কৃত্রিম তন্তু ও সস্তা আমদানিকৃত কাপড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে খাঁটি বুর্সা সিল্ককে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও তরুণ তুর্কিদের প্রবল আগ্রহ এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বুর্সা আজও তার ‍‍`সিল্ক সিটি‍‍` খ্যাতি ধরে রেখেছে।

বুর্সার রেশম শিল্পের এই গল্পটি আসলে মানুষের টিকে থাকার এবং সৃজনশীলতার গল্প। সিল্ক রোডের সেই হারানো দিনের স্মৃতি নিয়ে বুর্সা আজও দাঁড়িয়ে আছে এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশায়। আল জাজিরার এই প্রতিবেদনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্য কেবল জাদুঘরে রাখার বস্তু নয়, এটি বর্তমানের কর্মস্পৃহার চালিকাশক্তি। বুর্সার প্রতিটি রেশমি সুতায় মিশে আছে এক বিশাল সাম্রাজ্যের উত্থান আর অগণিত কারিগরের স্বপ্ন।

banner
Link copied!