ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন ছুটি এখনো বিশ্বের বহু ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে একটি স্বপ্নের মতো। তবে ২০২৬ সালের চিত্রটি গত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ, বিমানের আকাশছোঁয়া ভাড়া এবং বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপীয় পর্যটন খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন ইইএস সিস্টেমের কড়াকড়ি, যার ফলে প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও বিলম্বের ঘটনা বাড়ছে। বিবিসি ট্রাভেলের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্যারিস, রোম বা ডাবলিনের মতো বড় শহরগুলোতে ভ্রমণের হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কমে গেছে। তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ ইউরোপ ভ্রমণ ছেড়ে দিয়েছে বরং পর্যটকরা এখন অনেক বেশি সচেতন এবং বেছে বেছে এমন সব জায়গায় যাচ্ছেন যেখানে ভিড় কম এবং খরচ সাধ্যের মধ্যে।
বর্তমানে পর্যটকদের রুচিতে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রোম২রিও-এর ২০২৬ ট্রাভেল অ্যান্ড মোবিলিটি ট্রেন্ডস রিপোর্ট অনুযায়ী, ছোট শহর বা অখ্যাত গন্তব্যগুলোর প্রতি মানুষের আগ্রহ বিশ্বব্যাপী ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। পর্যটকরা এখন আর কেবল বড় বড় রাজধানী শহরগুলোতে আটকে থাকতে চাইছেন না। ইন্ট্রো ট্রাভেলের প্রতিষ্ঠাতা ব্রাইস কলিন্স জানিয়েছেন যে, মানুষ এখন ইতালি বা ফ্রান্সের সেই চিরচেনা আমেজ পেতে চায় কিন্তু জনাকীর্ণ রাস্তা বা উচ্চমূল্যের ধাক্কা এড়াতে চায়। উদাহরণস্বরূপ তিনি ক্রোয়েশিয়ার কর্চুলার কথা উল্লেখ করেছেন। ডাব্রোভনিকের মতো জনপ্রিয় জায়গায় না গিয়ে কর্চুলায় গেলে পর্যটকরা সেই একই ভেনিসীয় স্থাপত্য এবং অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন অনেক কম খরচে এবং ধীরস্থিরভাবে।
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আমেরিকান পর্যটকরা এখন দীর্ঘ সফরের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট দেশে গভীরভাবে ভ্রমণের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। টেনন ট্যুরসের প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান লুইস জানিয়েছেন যে, যাতায়াতের ঝক্কি কমাতে এবং খরচের ভারসাম্য বজায় রাখতে পর্যটকরা এখন ছোট কিন্তু সমৃদ্ধ দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। প্রাইসল্যাবস-এর তথ্য অনুযায়ী, আলবেনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার মতো দেশগুলোতে এখনো প্রতি রাতে থাকার খরচ ১০০ ইউরোর নিচে পাওয়া সম্ভব। এছাড়া পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় এই দেশগুলোতে খাবার, মিউজিয়ামের টিকিট এবং যাতায়াত খরচ অনেক কম।
এ বছরের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের জন্য স্লোভেনিয়াকে সবচেয়ে সেরা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আয়তনে ছোট হওয়ায় এই দেশটি পর্যটকদের জন্য খুবই সুবিধাজনক। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অনেক সময় সুইজারল্যান্ড বা উত্তর ইতালির সাথে তুলনা করা হয় কিন্তু খরচ সেখানে অনেক কম। আনফরগেটেবল ট্রাভেল কোম্পানির তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় স্লোভেনিয়ায় বুকিংয়ের হার প্রায় ২৮৬ শতাংশ বেড়েছে। এই দেশটি অস্ট্রিয়ার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সুইজারল্যান্ডের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি সাশ্রয়ী। বিশেষ করে পরিবারের সাথে ভ্রমণের জন্য স্লোভেনিয়াকে একটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং সহজলভ্য গন্তব্য হিসেবে ধরা হচ্ছে।
স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানা বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় শহর হয়ে উঠেছে। এখানকার নদীতীরবর্তী পুরনো শহরটি অনেকটা ভেনিসের অনুভূতি দেয়। এছাড়া আল্পাইন অঞ্চলের বোহিনজ বা ব্লেড লেক পর্যটকদের জন্য লেক কোমো-র একটি শান্ত বিকল্প হতে পারে। রোম২রিও-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিয়া মান্ডিচ জানিয়েছেন যে, বাস এবং ট্রেনের মাধ্যমে স্লোভেনিয়া থেকে খুব সহজেই জাগ্রেব বা ভিয়েনার মতো বড় শহরগুলোতে যাওয়া যায়। যারা ইউরোপের চিরাচরিত আভিজাত্য পেতে চান অথচ পকেটের কথা চিন্তা করছেন, তাদের জন্য বালকান অঞ্চলের এই দেশগুলোই হতে পারে ২০২৬ সালের সেরা পছন্দ।
